গত ১৮ জানুয়ারি সূর্য থেকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সৌর শিখা বা সোলার ফ্লেয়ার নির্গত হয়েছে। এই বিস্ফোরণের ফলে মহাকাশে বিশাল এক চুম্বকীয় প্লাজমার মেঘ তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে ১১০০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ডেরও বেশি প্রচণ্ড গতিতে সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২০ জানুয়ারি গ্রিনিচ মান সময় (UTC) সকাল ৯টার দিকে এটি পৃথিবীর চৌম্বক মণ্ডলে সরাসরি আঘাত হানবে। এই সংঘর্ষের ফলে জি-৪ (G4) মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় তৈরি হতে পারে, এমনকি পরিস্থিতি আরও চরম পর্যায়ে পৌঁছে জি-৫ (G5) মাত্রার একটি বিরল ইভেন্টে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
Strong S3 Solar Radiation Storm - Degraded HF radio at polar regions and navigation position errors, satellite effects on imaging systems and solar panel currents, radiation hazard to astronauts on EVA and high-latitude aircraft passengers Follow live on spaceweather.live/l/solar-activi…
এই মহাজাগতিক ঘটনার অনন্যতা এর আগাম সংকেতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মূল প্লাজমা মেঘ পৌঁছানোর আগেই ১৯ জানুয়ারি উচ্চ-শক্তির প্রোটন কণা পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছাতে শুরু করেছে, যাকে বিজ্ঞানীরা রেকর্ড ভাঙা 'প্রোটন ইভেন্ট' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ১০ মেগা-ইলেক্ট্রন ভোল্টের (10 MeV) বেশি শক্তির প্রোটন কণার প্রবাহ এক হাজার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১৯২০ ইউনিটে পৌঁছেছে। এটি ২০১৬ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড এবং মহাকাশ গবেষণায় ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির জন্য নির্ধারিত বিপৎসীমার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। গত এক বছরে মাত্র দুবার এমন তীব্রতা দেখা গিয়েছিল, যা আসন্ন প্লাজমা মেঘের প্রচণ্ড শক্তি ও গতির একটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে।
প্লাজমা মেঘের মূল অংশটি পৃথিবীতে আঘাত হানার পর এর বহুমুখী প্রভাব অনুভূত হবে। জি-৪ মাত্রার এই ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের অপারেটরদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি পাওয়ার গ্রিডে বড় ধরনের গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া স্যাটেলাইট নেভিগেশন এবং রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই ঝড়ের একটি ইতিবাচক ও মনোরম দিকও রয়েছে—তা হলো অত্যন্ত উজ্জ্বল মেরুজ্যোতি বা অরোরা। ২০ জানুয়ারি রাতের পরিষ্কার আকাশে উত্তর গোলার্ধের ৫০ থেকে ৫৫ ডিগ্রি অক্ষাংশ পর্যন্ত এই দৃশ্য দেখা যেতে পারে। এর ফলে উত্তর ইউরোপের কেন্দ্রীয় অঞ্চল, উত্তর আমেরিকা তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ও ওরেগন অঙ্গরাজ্য, কানাডা এবং এশিয়ার কিছু অংশে বসবাসকারীরা এই বিরল ও উজ্জ্বল অরোরা দেখার সুযোগ পাবেন।
বর্তমান সৌর চক্রের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির মধ্যে এই ঘটনাটি বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গবেষকরা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছেন এবং এই নির্গমনের সুনির্দিষ্ট দিক, এর অবিশ্বাস্য গতি এবং এর আগে ঘটে যাওয়া রেকর্ড পরিমাণ প্রোটন ঝড়ের বিরল সমন্বয় নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এই শক্তিশালী সৌর ঝড়টি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের জন্য যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি মহাকাশ বিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন নতুন তথ্য যোগ করার ক্ষেত্রে এটি এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের সৌর কার্যকলাপ আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে।
