একটি ধুলোঝড় সম্ভবত মঙ্গল থেকে পানি বঞ্চিত করেছে।
মঙ্গলের স্থানীয় ধূলিঝড় বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে জলীয় বাষ্পের স্থানান্তরে সহায়ক
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
মঙ্গলের বর্তমান রূপ একটি শুষ্ক, ধূলিময় এবং প্রাণহীন মরুভূমির মতো হলেও, এর ভূতাত্ত্বিক প্রমাণগুলো একটি অত্যন্ত আর্দ্র অতীতের দিকে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে। গ্রহটির উপরিভাগে শুকিয়ে যাওয়া প্রাচীন নদীখাত এবং জল দ্বারা রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত খনিজ পদার্থগুলো এই সাক্ষ্য দেয় যে, লাল গ্রহটি একসময় এমন এক জগত ছিল যা প্রাণ ধারণের জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী ছিল। আধুনিক গ্রহবিজ্ঞানীদের কাছে এখনও একটি কেন্দ্রীয় রহস্য হলো, ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় মঙ্গল তার আদি জলমণ্ডলের একটি বিশাল অংশ হারিয়ে ফেলল। বিজ্ঞানীদের অনুমান অনুযায়ী, কোটি কোটি বছর ধরে এই গ্রহটি মহাকাশে এত পরিমাণ জল হারিয়েছে যা দিয়ে এর পুরো পৃষ্ঠকে কয়েক মিটার পুরু জলের স্তরে ঢেকে দেওয়া সম্ভব ছিল।
২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি 'Communications Earth & Environment' নামক মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণাপত্রে আন্তর্জাতিক গবেষক দল এই বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেছেন। এই গবেষণার প্রধান লেখকদের মধ্যে রয়েছেন আন্দালুসিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (IAA-CSIC)-এর আদ্রিয়ানা ব্রিসেনো এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহিওক ওহ। তারা প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেছেন যে, অত্যন্ত তীব্র কিন্তু স্থানীয় এবং নির্দিষ্ট ঋতু বহির্ভূত ধূলিঝড় মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে জলীয় বাষ্পের একটি বড় অংশকে ঠেলে দিতে সক্ষম। বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে এই ঘটনাটি ঘটে, যা আগে বিজ্ঞানীদের কাছে জলীয় বাষ্প স্থানান্তরের জন্য একটি নিষ্ক্রিয় সময় হিসেবে পরিচিত ছিল।
মঙ্গলের জল হারানোর সামগ্রিক হার বোঝার জন্য বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ পরিমাপ করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই বাষ্পের অণুগুলো সূর্যালোকের প্রভাবে ভেঙে গিয়ে মহাকাশে বিলীন হয়ে যায়। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল যে, মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধের উষ্ণ গ্রীষ্মকালেই জলীয় বাষ্প সবচেয়ে বেশি উচ্চতায় পৌঁছায় এবং গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ কাটিয়ে মহাকাশে হারিয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক এই গবেষণায় ৩৭তম মঙ্গল বর্ষে (যা পৃথিবীর ক্যালেন্ডারে ২০২২-২০২৩ সালের সমতুল্য) মঙ্গলের মধ্য-বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের ঘনত্বের একটি অস্বাভাবিক এবং আকস্মিক বৃদ্ধি ধরা পড়েছে। এই বিশেষ বৃদ্ধিটি সির্তিস অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত আন্তোনিয়াদি ক্রেটার বা গহ্বর এলাকায় সৃষ্ট একটি শক্তিশালী স্থানীয় ঝড়ের কারণে ঘটেছিল।
এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি সম্ভব হয়েছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার এক্সোমার্স ট্রেস গ্যাস অরবিটার (TGO)-এ থাকা নোম্যাড (NOMAD) নামক অত্যাধুনিক যন্ত্রের তথ্যের মাধ্যমে। এর পাশাপাশি নাসা-র মার্স রিকনেসান্স অরবিটার (MRO) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমিরেটস মার্স মিশন (EMM) থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলোও এই গবেষণায় সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই অকাল এবং স্থানীয় ঝড়ের প্রভাবে জলীয় বাষ্পের একটি অভাবনীয় উদগিরণ ঘটে যা বায়ুমণ্ডলের ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। বিশেষ করে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধের উচ্চ অক্ষাংশগুলোতে জলের ঘনত্ব স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি ছিল, যা বর্তমানের কোনো জলবায়ু মডেল দিয়েই আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব হয়নি।
যদিও এই অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পুরো গ্রহে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পরে থিতিয়ে গিয়েছিল, তবুও এই সংক্ষিপ্ত ঘটনাটি জল হারানোর একটি নতুন এবং শক্তিশালী প্রক্রিয়াকে উন্মোচিত করেছে। এই ধূলিঝড় শেষ হওয়ার কিছুকাল পরেই মঙ্গলের এক্সোস্ফিয়ারে হাইড্রোজেনের পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরগুলোর একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২.৫ গুণ বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে। এই তথ্যটি নিশ্চিত করে যে, তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের আঞ্চলিক ঝড়গুলোও বায়ুমণ্ডলের উচ্চতর স্তরে জলীয় বাষ্প পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। সেখান থেকে এই জলীয় কণাগুলোর মহাকাশের শূন্যতায় হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে, যা গ্রহটির পানিশূন্য হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
এই নতুন গবেষণাটি মঙ্গলের লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলা পানিশূন্যতার দীর্ঘ ইতিহাসকে আরও পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করবে। এর আগে গবেষকরা যখন মঙ্গলের জলচক্রের গাণিতিক মডেল তৈরি করতেন, তখন তারা ধরে নিতেন যে জল হারানোর মূল কারণ হলো গ্রহব্যাপী বিশাল ধূলিঝড় এবং দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া। তবে TGO এবং NOMAD-এর মতো যন্ত্রের মাধ্যমে পাওয়া এই নতুন তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, মঙ্গলের জলবায়ু গতিবিদ্যা আসলে অনেক বেশি জটিল এবং বৈচিত্র্যময়। স্থানীয় আবহাওয়াগত অসঙ্গতিগুলো বায়ুমণ্ডলীয় উপাদান হারানোর ক্ষেত্রে আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে, যা লাল গ্রহের ভবিষ্যৎ জলবায়ু মডেলগুলোকে আরও নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত করার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
উৎসসমূহ
Рамблер
Astrobiology Web
Sci.News
Tohoku University
Wikipedia
NASA Goddard Space Flight Center
