MoM-z14, এখন পর্যন্ত যাচাই করা সবচেয়ে দূরবর্তী গ্যালাক্সি। এই ছবিতে আমরা একটি গ্যালাক্সি দেখতে পাচ্ছি যেভাবে এটি মহাবিশ্বের শুরু থেকে মাত্র 280 মিলিয়ন বছর পরে প্রকাশিত হয়েছিল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে আনুষ্ঠানিকভাবে 'MoM-z14' নামক একটি গ্যালাক্সির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। এটি বর্তমানে মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী এবং প্রাচীনতম গ্যালাক্সি হিসেবে রেকর্ড বইয়ে স্থান করে নিয়েছে। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাত্র ২৮০ মিলিয়ন বছর পরের এই মহাজাগতিক বস্তুটি বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের আদি অবস্থা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এর কসমোলজিক্যাল রেডশিফট বা মহাজাগতিক লাল বিচ্যুতি ১৪.৪৪ হিসেবে পরিমাপ করা হয়েছে, যা এর অবিশ্বাস্য প্রাচীনত্বের প্রমাণ দেয়। এই গ্যালাক্সি থেকে নির্গত যে আলো জেমস ওয়েবের শক্তিশালী সেন্সরে ধরা পড়েছে, তা পৃথিবীতে পৌঁছাতে প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন বছরের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। এটি আমাদের মহাবিশ্বের শৈশবকালের একটি বিরল এবং স্বচ্ছ চিত্র প্রদান করে।
টেলিস্কোপের এনআইআরস্পেক (NIRSpec) স্পেকট্রোগ্রাফের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, MoM-z14 গ্যালাক্সিটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে নক্ষত্র গঠন করছিল। প্রচলিত কসমোলজিক্যাল বা মহাজাগতিক মডেলগুলোতে মহাবিশ্বের এত প্রাথমিক পর্যায়ে ভারী উপাদানের উপস্থিতির যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, এই গ্যালাক্সিটি তার চেয়ে অনেক আগেই রাসায়নিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি অত্যন্ত ঘন এবং উজ্জ্বল গ্যালাক্সি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার আনুমানিক ভর প্রায় ১০^৮ সৌর ভরের সমান। এই ভর আমাদের আকাশগঙ্গার প্রতিবেশী স্মল ম্যাজেলানিক ক্লাউডের ভরের সাথে তুলনীয়। স্পেকট্রোস্কোপিক বিশ্লেষণে এই গ্যালাক্সিতে নাইট্রোজেনের শক্তিশালী উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত নিবিড় এবং দ্রুত নক্ষত্র গঠন প্রক্রিয়ার একটি স্পষ্ট সংকেত।
এই গবেষণার প্রাথমিক তথ্যগুলো ২০২৩ সালে প্রথম সংগৃহীত হয়েছিল এবং বর্তমানে এটি 'ওপেন জার্নাল অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স'-এ প্রকাশের জন্য চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT)-র রোহান নাইডু এবং জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাসকাল ওয়েশ। এমআইটি-র ডক্টরাল গবেষক জ্যাকব শেন এই আবিষ্কারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন যে, বর্তমান তাত্ত্বিক ধারণা এবং মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ের বাস্তব পর্যবেক্ষণের মধ্যে ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, MoM-z14-এর মতো প্রাথমিক গ্যালাক্সিগুলো জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণের আগে যতটা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি দেখা যাচ্ছে। এটি বিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক মডেল এবং বাস্তব পর্যবেক্ষণের মধ্যে এক বিশাল বৈষম্য তৈরি করেছে।
'MoM' (মিরাজ অর মিরাকল বা মরীচিকা না কি অলৌকিক) নামক একটি বিশেষ জরিপের অংশ হিসেবে এই গ্যালাক্সিটি খুঁজে পাওয়া গেছে। এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করে যে, আদি মহাবিশ্বের এই ধরনের গ্যালাক্সিগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি একটি নিয়মিত মহাজাগতিক প্যাটার্ন। এর আগে সবচেয়ে দূরবর্তী গ্যালাক্সির রেকর্ডটি ছিল JADES-GS-z14-0-এর দখলে, যার রেডশিফট ছিল ১৪.১৮। মহাবিশ্বের এত শুরুর দিকে নাইট্রোজেনের মতো উপাদানের উচ্চ মাত্রার উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, আদি মহাবিশ্বের নক্ষত্র বিবর্তনের প্রক্রিয়াগুলো আগের মডেলগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর এবং দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়েছিল। গবেষক রোহান নাইডু মন্তব্য করেছেন যে, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আমাদের সামনে এমন এক মহাবিশ্বকে উন্মোচিত করছে যা আমাদের পূর্ববর্তী সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।
এছাড়াও, MoM-z14 গ্যালাক্সিটি তার চারপাশের আদিম হাইড্রোজেন কুয়াশা বা গ্যাসীয় আবরণ সরিয়ে দেওয়ার লক্ষণ প্রদর্শন করছে। এটি মহাবিশ্বের 'রিআয়নাইজেশন' বা পুনঃআয়নকরণ যুগের সঠিক সময়কাল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য হিসেবে কাজ করবে। এই আবিষ্কারটি সরাসরি বর্তমান কসমোলজিক্যাল মডেলগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, বিশেষ করে মহাবিশ্বের ঊষালগ্নে গ্যালাক্সি গঠনের গতি এবং প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিচ্ছে। গবেষক ইই জিয়া লি আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভবিষ্যতে ন্যান্সি গ্রেস রোমান টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই ধরনের উজ্জ্বল এবং রাসায়নিকভাবে সমৃদ্ধ হাজার হাজার গ্যালাক্সি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং গ্যালাক্সির বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হবে।