মহাকাশ বিজ্ঞানের এক বিরল ঘটনা হিসেবে J1007+3540 গ্যালাক্সিতে একটি সক্রিয় গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস (AGN) পর্যায়ক্রমিক ভাবে চালু এবং বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘকাল সুপ্ত থাকার পর এই গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত বিশাল কৃষ্ণগহ্বরটি বা ব্ল্যাক হোলটি পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যাকে বিজ্ঞানীরা 'রিস্টার্ট' বা পুনর্জাগরণ হিসেবে অভিহিত করছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিখ্যাত 'মান্থলি নোটিস অফ দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি' (Monthly Notices of the Royal Astronomical Society) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লোফার (LOFAR) এবং ইউজিএমআরটি (uGMRT) রেডিও ইন্টারফেরোমিটার থেকে প্রাপ্ত রেডিও চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রায় ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি বছরের নীরবতা ভেঙে এই ব্ল্যাক হোলটি সম্প্রতি পুনরায় 'জ্বলে' উঠেছে।
এই নতুন বিকিরণটি একটি উজ্জ্বল এবং ঘন অভ্যন্তরীণ জেট বা প্রবাহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা পুরনো এবং ম্লান হয়ে যাওয়া প্লাজমার একটি 'কোকুন' বা আবরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসছে। এটি মূলত একটি এপিসোডিক বা পর্যায়ক্রমিক এজিএন-এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ব্ল্যাক হোল থেকে নির্গত এই প্লাজমা জেটগুলো মহাকাশে প্রায় ১০ লক্ষ আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিকৃতি ও সংকোচন লক্ষ্য করা গেছে। এই বিকৃতির মূল কারণ হলো গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের ভেতরে থাকা উত্তপ্ত গ্যাসের প্রচণ্ড বাহ্যিক চাপ, যেখানে মূল গ্যালাক্সিটি অবস্থিত। মণিপাল সেন্টার ফর ন্যাচারাল সায়েন্সেস (MCNS)-এর ডক্টর সুরজিৎ পাল উল্লেখ করেছেন যে, J1007+3540 গ্যালাক্সিটি ক্লাস্টার পরিবেশের সাথে পর্যায়ক্রমিক এজিএন-এর মিথস্ক্রিয়ার অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মেদিনীপুর সিটি কলেজের শোভা কুমারীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণা দলটি প্রকাশ করেছে যে, J1007+3540-এর অনন্যতা হলো এর একাধিকবার অগ্ন্যুৎপাত ঘটানোর ক্ষমতা। অর্থাৎ, এর কেন্দ্রীয় ইঞ্জিনটি মহাজাগতিক সময়ের ব্যবধানে চক্রাকারে চালু এবং বন্ধ হয়। ২০২৩ সালের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনগুলোতে ধারণা করা হয়েছিল যে, এই এজিএন-টি অন্তত ২০০ দিন ধরে 'বন্ধ' অবস্থায় ছিল। তবে ২০২৬ সালের নতুন তথ্য-উপাত্ত এর বর্তমান সক্রিয়তাকে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেছে। এই বিশেষ ঘটনাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের রেডিও জেটের বিবর্তন এবং ক্লাস্টারের ঘন পরিবেশ কীভাবে এই নির্গমনের রূপরেখা তৈরি করে, তা গভীরভাবে অধ্যয়নের সুযোগ করে দিচ্ছে।
লোফার (LOFAR) এবং ইউজিএমআরটি (uGMRT) টেলিস্কোপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের ফলে শুধুমাত্র নতুন সক্রিয়তাই ধরা পড়েনি, বরং সেখানে কিছু 'অবশিষ্টাংশ' কাঠামোও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। পূর্ববর্তী অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট পুরনো এবং ম্লান হয়ে যাওয়া অংশগুলো এজিএন-এর শক্তি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর কোটি কোটি বছর ধরে নিম্ন রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে দৃশ্যমান থাকে। বিশেষ করে, লোফার থেকে প্রাপ্ত ছবিতে একটি সংকুচিত উত্তর অংশ দেখা গেছে, যেখানে ক্লাস্টার গ্যাসের বাধার কারণে প্লাজমা পার্শ্বীয়ভাবে সরে গেছে। ইউজিএমআরটি-র তথ্য আরও প্রমাণ করেছে যে, এই সংকুচিত অঞ্চলটি মূলত পুরনো কণা দ্বারা গঠিত যা তাদের শক্তির একটি বড় অংশ হারিয়ে ফেলেছে, যা ক্লাস্টারের প্রভাবের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
গবেষক দলটি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ভিএলএ (VLA) এবং আলমা (ALMA) টেলিস্কোপ ব্যবহার করে উচ্চ-রেজোলিউশন পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই ভবিষ্যৎ গবেষণার লক্ষ্য হলো নতুনভাবে চালু হওয়া জেটগুলোর বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করা এবং এই সক্রিয়তা চক্রের সঠিক ফ্রিকোয়েন্সি বা হার নির্ধারণ করা। J1007+3540-এর মতো গতিশীল সিস্টেমগুলো অধ্যয়ন করার মাধ্যমে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলগুলো কীভাবে গ্যালাক্সির বৃদ্ধি এবং বিবর্তনকে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে অমূল্য তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের কঠোর পরিবেশগত প্রভাবে ব্ল্যাক হোলের সক্রিয় এবং সুপ্ত অবস্থার আচরণগত মডেলগুলোকে আরও নিখুঁত করতে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
