এই ছবিতে প্রথম 'অ্যাস্ট্রোস্ফিয়ার' একটি সূরির মতো নক্ষত্রকে ঘিরে রয়েছে, যা আমাদের সূর্যের চেয়ে বেশি যুবা।
জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীরা মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তারা প্রথমবারের মতো সূর্যের মতো একটি নক্ষত্র HD 61005-কে ঘিরে থাকা তথাকথিত 'অ্যাস্ট্রোস্ফিয়ার'-এর একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বিস্তারিত এক্স-রে চিত্র ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা-র চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরির শক্তিশালী লেন্সের মাধ্যমে এই অভূতপূর্ব পর্যবেক্ষণটি সম্পন্ন হয়েছে। নক্ষত্রের বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায় এবং তাদের পরিবেশের ওপর প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদানকারী এই গবেষণার ফলাফলগুলো সম্প্রতি মর্যাদাপূর্ণ 'দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল'-এ প্রকাশিত হয়েছে।
এখন পর্যন্ত সূর্যের মতো তারা চারপাশে এই ধরনের বুদ্বুদসমূহ থিওরির দ্বারা পূর্বানুমান করা হয়েছে, তবে সেগুলির বিকিরণ দুর্বল এবং বিস্তৃত হওয়ায় সেগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা খুবই কঠিন ছিল।
মহাজাগতিক মানচিত্রে HD 61005 নক্ষত্রটির অবস্থান পৃথিবী থেকে প্রায় ১২০ আলোকবর্ষ দূরে, যা পপিস বা 'নৌকার পশ্চাৎভাগ' নামক নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত। ভর এবং তাপমাত্রার দিক থেকে এই নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের সাথে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও, বিবর্তনের ধারায় এটি অনেক বেশি নবীন। বিজ্ঞানীদের মতে এর বয়স মাত্র ১০০ মিলিয়ন বছর, যা আমাদের ৪.৬ বিলিয়ন বছর বয়সী সূর্যের তুলনায় নেহাতই শৈশব। এই তরুণ নক্ষত্রটির নাক্ষত্রিক বায়ু বা স্টেলার উইন্ড অবিশ্বাস্যভাবে সক্রিয়; এর গতিবেগ বর্তমান সৌর বায়ুর চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি এবং কণার ঘনত্ব আমাদের সূর্যের বায়ুর তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি শক্তিশালী।
বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় অ্যাস্ট্রোস্ফিয়ার হলো মূলত অতি-উত্তপ্ত গ্যাসে পূর্ণ একটি বিশাল গহ্বর। যখন নক্ষত্র থেকে নির্গত তীব্র বায়ু চারপাশের অপেক্ষাকৃত শীতল আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস ও ধূলিকণার স্তরে সজোরে আঘাত করে, তখন এই বিশেষ কাঠামোটি তৈরি হয়। এই কাঠামোটি অনেকটা আমাদের সূর্যের হেলিওস্ফিয়ারের মতোই কাজ করে, যা নক্ষত্রমন্ডলীকে বাইরের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্রের চারপাশে অ্যাস্ট্রোস্ফিয়ারের এই প্রথম এক্স-রে প্রমাণ বিজ্ঞানীদের আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের হেলিওস্ফিয়ার গঠনের প্রাথমিক ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই বিশাল অ্যাস্ট্রোস্ফিয়ারটির ব্যাস প্রায় ২০০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই বিশেষ কাঠামোটি দৃশ্যমান হওয়ার মূল কারণ হলো উচ্চ-গতির নাক্ষত্রিক বায়ু এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের সংযোগস্থলে উৎপন্ন শক্তিশালী এক্স-রে বিকিরণ। HD 61005 নক্ষত্রটি বর্তমানে মহাকাশের এমন একটি ঘন অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে যেখানে আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের ঘনত্ব সূর্যের বর্তমান চারপাশের তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ বেশি। ২০১৪ সালে চন্দ্র অবজারভেটরির মাধ্যমে মাত্র এক ঘণ্টার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এই এক্স-রে আভার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তবে ২০২১ সালে দীর্ঘ সময়ের এক্সপোজার এবং নিবিড় বিশ্লেষণের পর এই বিস্তৃত কাঠামোর অস্তিত্ব চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির বিশিষ্ট গবেষক কেরি লিসের নেতৃত্বে এই পুরো গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয়েছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে HD 61005 নক্ষত্রটি অনানুষ্ঠানিকভাবে 'দ্য মথ' বা 'পতঙ্গ' নামে পরিচিত। ইনফ্রারেড বা অবলোহিত আলোকতরঙ্গে এর চারপাশের ধূলিকণার চাকতিটি দেখতে অনেকটা ডানা মেলা পতঙ্গের মতো মনে হয় বলেই এই নামকরণ। এই ধূলিকণার চাকতিটি আমাদের সৌরজগতের কুইপার বেল্টের একটি আদিম সংস্করণের মতো। এই ধরনের পর্যবেক্ষণগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ এগুলো থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে কোটি কোটি বছর আগে আমাদের সূর্যের সৌর বায়ু যখন ঘন আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া করত, তখন তা দেখতে কেমন ছিল। মহাকাশে তীব্র গতিতে চলার সময় নক্ষত্রটি তার সামনে একটি ধনুকাকৃতি তরঙ্গ বা 'বো শক' তৈরি করে, যা এই মহাজাগতিক কাঠামোর গতিশীল ও পরিবর্তনশীল রূপকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।