Хуан-Фернандеса এর চারপাশে সমুদ্র প্রায় এক মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার আয়তনের জায়গা হয়ে বিশ্বের জীবনের স্থান হয়ে দাঁড়ায়।
চিলির সামুদ্রিক বিপ্লব: হুয়ান ফার্নান্দেজ দ্বীপপুঞ্জ এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সংরক্ষিত জলসীমা
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
২০২৬ সালের মার্চ মাসে চিলি সরকার দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্র সংরক্ষণের মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশটি পরিবেশ রক্ষায় তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
হুয়ান ফার্নান্দেজ দ্বীপপুঞ্জের (Juan Fernández Archipelago) চারপাশের সম্পূর্ণ সুরক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চলের আয়তন আরও ৩৩৭,০০০ বর্গকিলোমিটার বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে সংরক্ষিত মোট এলাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪৬,৫৭১ বর্গকিলোমিটারে, যা একটি বিশাল মাইলফলক।
এই বিশাল আয়তনের কারণে দ্বীপপুঞ্জটি এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সম্পূর্ণ সংরক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এটি এখন কেবল অ্যান্টার্কটিকার রস সাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পাপাহানাউমোকুয়াকিয়া (Papahānaumokuākea) মেরিন ন্যাশনাল মনুমেন্টের পরেই নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কেবল এর বিশাল আয়তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই উদ্যোগটি শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টার এক অনন্য ফসল।
এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে হুয়ান ফার্নান্দেজ ফার সিল বা সামুদ্রিক সিল। এক সময় এই বিশেষ প্রজাতিটি পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন।
বিখ্যাত সমুদ্র গবেষক সিলভিয়া আর্ল (Sylvia Earle) ১৯৬৫ সালে পুনরায় এই প্রজাতির সন্ধান পান। তার এই যুগান্তকারী আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, মহাসাগরকে যদি পর্যাপ্ত সময় ও সুরক্ষা দেওয়া হয়, তবে তা নিজে থেকেই পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে।
১৭শ থেকে ১৯শ শতাব্দীর মধ্যে পশম এবং চর্বির লোভে এই সিলগুলোকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে চিলি সরকার এদের পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করে এবং আজ তারা এই দ্বীপপুঞ্জের জীবন্ত বাস্তুসংস্থানের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
নতুন এই সরকারি অধ্যাদেশ অনুযায়ী বর্ধিত সামুদ্রিক অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার কথা মাথায় রেখে একটি বিশেষ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
দ্বীপের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘জাসাস ফ্রন্টালিস’ (Jasus frontalis) নামক স্থানীয় লবস্টার বা ল্যাঙ্গুস্টের টেকসই শিকার। স্থানীয় অর্থনীতির প্রায় ৭০ শতাংশই সরাসরি এই বিশেষ মৎস্য শিকারের ওপর নির্ভরশীল।
এই ছাড়টি প্রকৃতির সাথে কোনো আপস নয়, বরং পরিবেশের সাথে মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। দ্বীপবাসী গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টেকসই মৎস্য শিকারের কঠোর নীতি মেনে চলছেন।
এখানকার মৎস্য শিকারের নিয়মগুলো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল:
- প্রতি বছর নির্দিষ্ট চার মাসের জন্য মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে।
- ডিমওয়ালা স্ত্রী লবস্টার ধরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- শিকার করা লবস্টারের আকারের ওপর নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা বজায় রাখা হয়।
- কেবল দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দারাই মাছ ধরার লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য।
- এই বিশেষ অনুমতিপত্রগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়।
২০১৫ সালে এই মৎস্য শিল্প মেরিন স্টুয়ার্ডশিপ কাউন্সিল (MSC) থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। এটি একটি বিরল ঘটনা যেখানে কোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সরাসরি বাস্তুসংস্থান রক্ষার একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
এই সম্প্রসারণের পর চিলি এখন তাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (EEZ) প্রায় ৫৪ শতাংশ এলাকা সংরক্ষণ করছে। এর ফলে দেশটি ফরাসি পলিনেশিয়া এবং পানামার মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সমুদ্র সংরক্ষণকারী দেশগুলোর কাতারে নিজের নাম লিখিয়েছে।
চিলির পরিবেশ মন্ত্রী মাইসা রোজাস (Maisa Rojas) এই পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, এই নতুন সামুদ্রিক পার্কগুলো এমন এক বাস্তুসংস্থানকে রক্ষা করছে যেখানে এন্ডেমিজম বা স্থানীয় প্রজাতির হার অবিশ্বাস্যভাবে বেশি।
এই অঞ্চলের জলরাশিতে প্রায় ৮৭ শতাংশ মাছই এন্ডেমিক, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এছাড়া এখানে সমুদ্রতলের পাহাড়ে প্রাচীন শীতল পানির প্রবাল এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের অনন্য খাদ্যশৃঙ্খল সংরক্ষিত রয়েছে।
এই বিশাল উদ্যোগটি সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেটের (Michelle Bachelet) আমলে শুরু হয়েছিল এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিকের (Gabriel Boric) সময় তা পূর্ণতা পেয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার এটি একটি বিরল ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক বিষয় হলো, এই সুরক্ষার প্রস্তাবটি এসেছিল খোদ দ্বীপপুঞ্জের সাধারণ বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে। এটি প্রচলিত রাষ্ট্রীয় মডেলকে বদলে দিয়েছে, যেখানে সাধারণত রাষ্ট্র মানুষের হাত থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।
এখানে মানুষ এবং রাষ্ট্র কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের নিজেদের ভূখণ্ড এবং সমুদ্রের যত্ন নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ থাকায় এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলোই ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং কার্যকর হবে।
পৃথিবীর বড় কোনো পরিবর্তনের জন্য সবসময় কেবল উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না, বরং প্রকৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধই যথেষ্ট। বিখ্যাত সমুদ্রবিদ জ্যাক-ইভ কুস্তো (Jacques Yves Cousteau) যেমনটি বলেছিলেন, “মানুষ কেবল তাকেই রক্ষা করে যাকে সে ভালোবাসে।”
উৎসসমূহ
The Guardian
The Guardian
Oceanographic
Ocean and Coastal Futures
Blue Marine Foundation
Mondaq



