৪ কিলোমিটার গভীরে আবিষ্কৃত ‘বৃক্ষ-সদৃশ’ স্কুইড: গভীর সমুদ্রের ছদ্মবেশের এক নতুন কৌশল

লেখক: Inna Horoshkina One

বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত মহাসাগরের ৪ কিলোমিটার গভীরতায় ডিপ-সি স্কুইডকে ‘গাছ হয়ে যাচ্ছে’—এমন দৃশ্য ধারণ করছেন

প্রশান্ত মহাসাগরের অতল গহ্বরে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এমন এক গভীর সমুদ্রের স্কুইড প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন, যার ছদ্মবেশ ধারণের পদ্ধতি অত্যন্ত বিস্ময়কর। এই প্রাণীটি নিজেকে উল্লম্বভাবে স্থাপন করে সমুদ্রের তলদেশের উদ্ভিদ বা কোনো প্রাকৃতিক কাঠামোর মতো রূপ ধারণ করে।

এই অভাবনীয় পর্যবেক্ষণটি করা হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন জোনের (Clarion-Clipperton Zone) প্রায় ৪.১ কিলোমিটার গভীরে। এত বিশাল গভীরতায় কোনো স্কুইডের এমন আচরণ আগে কখনো দেখা যায়নি।

গবেষকদের মতে, স্কুইড প্রজাতির মধ্যে এই ধরনের বিশেষ আচরণের এটিই প্রথম ভিডিও ডকুমেন্টেশন বা ভিডিওর মাধ্যমে নথিবদ্ধ প্রমাণ। এই আবিষ্কারটি সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ কৌশলটিকে ‘অ্যাগ্রেসিভ মিমিক্রি’ বা আক্রমণাত্মক অনুকরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখানে স্কুইডটি কেবল নিজেকে লুকিয়ে রাখে না, বরং সে নিজেকে সমুদ্রের তলদেশের ল্যান্ডস্কেপ বা ভূ-প্রকৃতির একটি অংশে পরিণত করে।

এই প্রক্রিয়ায় স্কুইডটি একটি নির্দিষ্ট উল্লম্ব ভঙ্গি গ্রহণ করে, যা তাকে চারপাশের পরিবেশের সাথে মিশে যেতে সাহায্য করে। এই অবস্থায় তাকে চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

উল্লম্বভাবে অবস্থান করার সময় এই প্রাণীটিকে নিচের বিষয়গুলোর মতো মনে হতে পারে:

  • সামুদ্রিক স্পঞ্জ
  • সমুদ্রের তলদেশের কোনো কঠিন কাঠামো
  • কোনো ডুবন্ত বস্তুর কাণ্ড বা ‘স্টেম’

এই অদ্ভুত ছদ্মবেশ প্রাণীটিকে দ্বিমুখী সুবিধা প্রদান করে। এটি একদিকে যেমন বড় শিকারি প্রাণীদের নজর থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে, তেমনি অন্যদিকে শিকার ধরার জন্য অত্যন্ত নিপুণভাবে ওত পেতে থাকতে পারে।

অভিযান থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে যে, এই প্রাণীটি ‘হুইপল্যাশ স্কুইড’ (whiplash squid) গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এটি ‘মাস্টগোটেউথিডি’ (Mastigoteuthidae) পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গবেষক দলের মতে, এটি সম্ভবত বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ নতুন এবং এখন পর্যন্ত অবর্ণিত একটি প্রজাতি। এই আবিষ্কারটি গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের বৈচিত্র্য সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও প্রসারিত করেছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই ভিডিও ফুটেজে আরও একটি সম্ভাব্য নতুন গভীর সমুদ্রের স্কুইড প্রজাতির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এটি নির্দেশ করে যে আমাদের মহাসাগরগুলোর বিশাল গভীরতায় এখনও কত অজানা প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে।

এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর জীববৈচিত্র্য আজও কতটা অনুদঘাটিত রয়ে গেছে। প্রতিটি নতুন অভিযান আমাদের সামনে প্রকৃতির এক নতুন রহস্য উন্মোচন করছে।

এই ধরনের পর্যবেক্ষণগুলো আমাদের দেখায় যে, এমনকি আমাদের পরিচিত প্রাণীর দলগুলোও এমন সব অজানা অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন হতে পারে যা আগে কখনো ভাবা হয়নি। প্রকৃতি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কত বৈচিত্র্যময় পথ বেছে নেয়, এটি তার প্রমাণ।

গভীর সমুদ্র আজও আমাদের গ্রহের সবচেয়ে কম অন্বেষণ করা বাস্তুসংস্থানগুলোর মধ্যে একটি। এখানে প্রতিটি নতুন তথ্য বা দৃশ্য পৃথিবীর প্রাণের মানচিত্রকে আক্ষরিক অর্থেই আরও সমৃদ্ধ এবং বিস্তৃত করে তোলে।

কখনও কখনও মহাসাগর আমাদের কেবল নতুন কোনো প্রজাতিই উপহার দেয় না, বরং জীবনকে দেখার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও শিখিয়ে দেয়। এই ‘বৃক্ষ-সদৃশ’ স্কুইডটি সেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি অংশ।

এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করে যে, সমুদ্রের গভীরতা কোনো শূন্যস্থান নয়, বরং এটি প্রকৃতির অসীম সৃজনশীলতার এক বিশাল চারণভূমি। যেখানে প্রতিকূল পরিবেশেও প্রাণের বিকাশ ঘটে নিজস্ব নিয়মে।

আমরা সমুদ্রের যত গভীরে প্রবেশ করছি, ততই বুঝতে পারছি যে এই নীল জলরাশি তার রহস্যময় গল্পগুলো কেবল আমাদের শোনাতে শুরু করেছে। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার সেই গল্পের এক একটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়।

13 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
৪ কিলোমিটার গভীরে আবিষ্কৃত ‘বৃক্ষ-সদৃশ’ স্... | Gaya One