«ফিশ ডিস্কো»: সমুদ্রের তলদেশে মাছ রক্ষায় এক অভিনব শব্দপ্রাচীর

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

Hinkley Point C-এ মাছের সুরক্ষা ব্যবস্থা

হিংকলি পয়েন্ট সি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জল আহরণ কেন্দ্রে পরিযায়ী সামুদ্রিক প্রাণীদের সুরক্ষায় এক অভিনব এবং উচ্চপ্রযুক্তির শব্দভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষকদের কাছে এটি «ফিশ ডিস্কো» নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই আধুনিক অ্যাকোস্টিক ডিটারেন্ট সিস্টেমটি সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান রক্ষায় এবং মাছের অকাল মৃত্যু রোধে অভূতপূর্ব কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছে।

সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত একটি নতুন গবেষণায় এই প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যের কথা উঠে এসেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ৩০০টিরও বেশি পানির নিচের স্পিকারের সমন্বয়ে গঠিত এই ব্যবস্থাটি বিশেষ ধরনের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে মাছকে বিপজ্জনক এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এই সিস্টেমটি মাছকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইনটেক জোন থেকে দূরে রাখতে ৯০ শতাংশেরও বেশি সফল হয়েছে।

এই বিশেষ অ্যাকোস্টিক সিগন্যালগুলো মাছের জন্য পানির নিচে একটি অদৃশ্য শব্দপ্রাচীর তৈরি করে। মাছের কাছে এই শব্দগুলো একটি প্রতিকূল পরিবেশের সংকেত হিসেবে কাজ করে, ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই সেই এলাকা এড়িয়ে চলে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই শব্দতরঙ্গ মাছের কোনো ধরনের শারীরিক ক্ষতি করে না।

সমুদ্রের তলদেশে পরিচালিত নিবিড় পরীক্ষার সময় এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী:

  • যখন এই শব্দ ব্যবস্থাটি সক্রিয় ছিল, তখন মাত্র একটি ট্যাগ করা মাছ জল আহরণ কেন্দ্রের ৩০ মিটারের মধ্যে প্রবেশ করেছিল।
  • এর বিপরীতে, যখন শব্দ ব্যবস্থাটি বন্ধ রাখা হয়েছিল, তখন অন্তত ১৪টি মাছ সেই একই বিপজ্জনক সীমানার মধ্যে চলে এসেছিল।

বিশেষ করে পুজাঙ্ক (Twaite shad) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিযায়ী প্রজাতির মাছের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। এই মাছগুলো সাধারণত তাদের প্রজনন বা পরিযানের সময় বিপদের সম্মুখীন হয়, যা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।

এই প্রকল্পটি ইডিএফ এনার্জি (EDF Energy) কোম্পানির একটি বিশাল পরিবেশগত বিনিয়োগের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিশাল অবকাঠামো যাতে সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।

এই প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যের কারণে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো এখন তাদের পূর্ববর্তী কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। আগে পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ৯০০ একর লবনাক্ত জলাভূমি (saltmarshes) তৈরির যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এই প্রযুক্তির সাফল্যের কারণে তা এখন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে সামুদ্রিক প্রাণ রক্ষায় একটি সমন্বিত এবং বহুমুখী পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই পদ্ধতির মূল স্তম্ভগুলো হলো:

  • উন্নত অ্যাকোস্টিক ডিটারেন্ট বা শব্দভিত্তিক বিতাড়ন ব্যবস্থা।
  • বিশেষভাবে নকশা করা ইনটেক হেড যা অত্যন্ত ধীর গতিতে জল শোষণ করে, ফলে মাছ আটকা পড়ার ঝুঁকি কমে।
  • পানির প্রবাহের বুদ্ধিমান এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা।

বিশেষজ্ঞদের গাণিতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই আধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাটি ব্যবহারের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৪৪ টন মাছ রক্ষা পাবে। এটি কেবল একটি যান্ত্রিক সাফল্য নয়, বরং শিল্পায়নের সাথে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার একটি অনন্য উদাহরণ।

গবেষণার এই গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলো ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য এটি পরিবেশগত দায়িত্বশীলতার একটি নতুন বৈশ্বিক মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে। সারা বিশ্বের উপকূলীয় অবকাঠামোতে এই মডেলটি অনুসরণ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই ঘটনাটি আমাদের গ্রহের প্রাকৃতিক ধ্বনিতে এক নতুন এবং ইতিবাচক মাত্রা যোগ করেছে। এখানে শব্দ কেবল যান্ত্রিক কোলাহল নয়, বরং এটি প্রযুক্তি এবং জীবন্ত প্রকৃতির মধ্যে এক গভীর সংলাপের ভাষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

যখন আধুনিক অবকাঠামো প্রকৃতিকে দমন না করে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শেখে, তখনই একটি সুন্দর এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। এটি এমন এক ভবিষ্যৎ যেখানে প্রযুক্তি এবং প্রকৃতি উভয়েই বিজয়ী হয়।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Guardian

  • The Guardian

  • Burnham-On-Sea.com

  • Streamline Feed

  • EDF

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।