২০২৫ সালে এন্টার্কটিকা মহাদেশ তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা প্রত্যক্ষ করেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাসে এক উদ্বেগজনক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন বৈশ্বিক জলবায়ু নীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছরের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের (১৮৫০-১৯০০) তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সংকটজনক সীমা প্রথমবারের মতো অতিক্রম করেছে। এই ধারাবাহিক উষ্ণায়ন বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি 'কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস' (C3S) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক গড় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন স্তরের চেয়ে ১.৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ইউরোপীয় সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস (ECMWF), যা C3S পরিচালনা করে, এই তথ্য প্রকাশে নাসা (NASA), নোয়া (NOAA) এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) সাথে নিবিড়ভাবে সমন্বয় করেছে। টানা তিন বছর এই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের দ্রুততর গতিরই একটি শক্তিশালী সংকেত।
২০২৫ সালে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে ২০২৪ সালের তুলনায় চরম তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকলেও, মেরু অঞ্চলের অস্বাভাবিক উষ্ণতা সেই প্রভাবকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে। আর্কটিক অঞ্চল তার ইতিহাসের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর পার করলেও, এন্টার্কটিকা বার্ষিক গড় তাপমাত্রার ক্ষেত্রে তার আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এছাড়া, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেরু অঞ্চলের সামুদ্রিক বরফের পরিমাণ ১৯৭০-এর দশকের উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি।
C3S-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ইতিহাসের তৃতীয় উষ্ণতম বছর হিসেবে স্থান পেয়েছে। এই তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ২০২৪ এবং ২০২৩ সাল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৩ এবং ২০২৫ সালের তাপমাত্রার ব্যবধান ছিল মাত্র ০.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১১ বছর ধারাবাহিকভাবে ইতিহাসের উষ্ণতম ১১টি বছরের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। রাশিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সেসের (INP RAS) শিক্ষাবিদ বরিস পোরফিরিয়েভ উল্লেখ করেছেন যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন স্তরকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী ২০ বছরের গড় তাপমাত্রার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়, তবে ২০২৩-২০২৫ সালের এই তিন বছরের ধারাবাহিকতা জলবায়ু সংকটের তীব্রতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমান সরকারি প্রতিশ্রুতিগুলো বজায় থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বিশ্বের তাপমাত্রা ২.৩ থেকে ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই তথ্যগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে আরও কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়।
ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের ফলে এল নিনোর প্রভাব আরও শক্তিশালী হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষের গড় আয়ু কমে যাওয়ার মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ প্রায় ৩৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। এই বিশাল আর্থিক ও মানবিক বিপর্যয় এড়াতে বিশ্বনেতাদের এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
