পৃথিবীর দীর্ঘতমজীবী মেরুদণ্ডী প্রাণী গ্রিনল্যান্ড হাঙর (Somniosus microcephalus) নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করেছে। এই গভীর সমুদ্রের বাসিন্দারা তাদের চরম দীর্ঘ জীবনকাল সত্ত্বেও একটি কার্যকর দৃশ্যমান ব্যবস্থা বজায় রাখে, যা পূর্বেকার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে, চোখে কর্নিয়াল পরজীবী (Ommatokoita elongata) লেগে থাকা এবং গভীর অন্ধকারে বসবাসের কারণে এই হাঙরগুলি কার্যত অন্ধ।
ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, আর্ভিনের সহযোগী অধ্যাপক ডরোটা স্কোভরোনস্কা-ক্রাভচিক এবং তাঁর সহকর্মীরা এই ভিন্ন চিত্রটি তুলে ধরেছেন। এই অনুসন্ধানটি *নেচার কমিউনিকেশনস* (Nature Communications) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞানীরা শতবর্ষী হাঙরের চোখ বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এদের রেটিনা সম্পূর্ণরূপে রড (rod)-নির্ভর, যা তাদের গভীর আবাসস্থলের ক্ষীণ নীল আলোর জন্য উপযুক্ত। এই রড কোষগুলি অত্যন্ত ঘনভাবে সজ্জিত, যা প্রতিটি বিক্ষিপ্ত ফোটনকেও ধরতে সক্ষম। হাঙরগুলি সাধারণত আর্কটিক এবং উত্তর আটলান্টিকের প্রায় ৩,০০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত বিচরণ করে, যেখানে আলোর অভাব চরম।
দৃষ্টিশক্তির কার্যকারিতা বজায় রাখার মূল কারণ হিসেবে গবেষকরা শক্তিশালী ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করেছেন, যা শত শত বছর ধরে রেটিনার স্বাস্থ্য রক্ষা করে। বেশিরভাগ মেরুদণ্ডী প্রাণীর ক্ষেত্রে বার্ধক্যের প্রধান লক্ষণ হলো রেটিনার অবক্ষয় ও কোষের মৃত্যু, কিন্তু এই প্রাচীন হাঙরগুলির প্রাচীনতম নমুনাতেও রেটিনাল অবক্ষয় বা কোষ মৃত্যুর কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তুলনামূলকভাবে, মানুষের ক্ষেত্রে প্রতি বছর রড কোষ ক্ষয় হয়, কিন্তু গ্রিনল্যান্ড হাঙর এই প্রাকৃতিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করে।
হাঙরের রেটিনায় উপস্থিত রোডোপসিন (Rhodopsin) নামক আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিনটি বিশেষভাবে ৪৮৮ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য সূক্ষ্মভাবে টিউন করা, যা গভীর মহাসাগরে প্রবেশ করা নীল আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে। গবেষকরা ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের ডিসকো দ্বীপের কাছে বৈজ্ঞানিক লং লাইন ব্যবহার করে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন, যার মধ্যে কিছু হাঙরের বয়স ১৩০ বছরের বেশি ছিল। ইউনিভার্সিটি অফ বাসেলের গবেষক ওয়াল্টার সালজবার্গার এবং লিলি জি. ফগ এই গবেষণার বিবর্তনীয় দিকটি নিয়ে কাজ করেছেন। তারা আরও লক্ষ্য করেছেন যে, হাঙরগুলি আলোর দিকে চোখ ঘোরায়, যা প্রমাণ করে তাদের দৃষ্টিশক্তি কার্যকরী।
এই আবিষ্কার মানব চক্ষুর বার্ধক্যজনিত রোগ, যেমন গ্লুকোমা এবং ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (macular degeneration)-এর ভবিষ্যতের চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সরবরাহ করতে পারে। এই গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘজীবী প্রজাতির কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাচ্ছেন যে কীভাবে টিস্যুগুলিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সুস্থ রাখা যায়, যা মানব চক্ষুর স্বাস্থ্য রক্ষায় নতুন পথ খুলে দিতে পারে। এই গবেষণাটি ২০১৬ সালে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক জন ফ্ল্যাং স্টিফেনসেনের *বিজ্ঞান* (Science) জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা গ্রিনল্যান্ড হাঙরকে দীর্ঘতমজীবী মেরুদণ্ডী প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।




