কানাডিয়ান নাগরিকদের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে প্রবেশের প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে সহজতর করা হয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকার শর্তে উভয় দেশ ৩০ দিনের একটি পারস্পরিক ভিসা-মুক্ত চুক্তিতে পৌঁছেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি বেইজিং সফরকালে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়, যেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহ চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা করেন। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা।
এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে পর্যটন, ব্যবসায়িক মিটিং, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ এবং ট্রানজিটের উদ্দেশ্যে স্বল্পমেয়াদী ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোনো ভিসার প্রয়োজন হবে না। কানাডা এখন সেই সব দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো যারা চীনের এই বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। ভ্যাঙ্কুভার, টরন্টো এবং মন্ট্রিলের মতো কানাডার বড় শহরগুলোর পর্যটন শিল্প এই সিদ্ধান্তের ফলে ইতিবাচক প্রভাব আশা করছে।
নাগরিকদের এই অবাধ চলাচলের চুক্তিটি মূলত একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্যাকেজের অংশ। ২০২৪ সালে কানাডা যখন চীনা বৈদ্যুতিক যান (EV), ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়ামের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল, তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এর জবাবে চীন কানাডিয়ান রেপসিড তেল এবং খাবারের ওপর আমদানি খরচ নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা কানাডিয়ান কৃষকদের জন্য নতুন বাজার খোঁজার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নতুন এই সমঝোতার আওতায়, বেইজিং আগামী ১ মার্চের মধ্যে কানাডিয়ান ক্যানোলার ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে প্রায় ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আগে এই শুল্কের হার ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ, যা ক্যানোলা রপ্তানিকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল। আশা করা হচ্ছে যে, এই হ্রাসকৃত শুল্ক হার অন্তত চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে।
ক্যানোলা ছাড়াও মটরশুঁটি, লবস্টার এবং কাঁকড়ার মতো পণ্যের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্কও মার্চ মাস থেকে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে ৪ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার মূল্যের বাজার পুনরায় উন্মুক্ত হতে পারে। বিনিময়ে, কানাডা একটি নির্দিষ্ট কোটার অধীনে ৪৯,০০০ চীনা বৈদ্যুতিক যান আমদানির অনুমতি দেবে, যেখানে শুল্কের হার ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৬.১ শতাংশ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি চীনে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর শুরু করেন এবং ১৭ জানুয়ারি তা সমাপ্ত করেন। চার দিনের এই সফরে তিনি চীনের প্রিমিয়ার লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে নিবিড় বৈঠক করেন। কার্নি এই চুক্তিকে "যুগান্তকারী" এবং "ঐতিহাসিক" বলে অভিহিত করেছেন, যা কানাডিয়ান কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সুযোগ তৈরি করবে। আট বছরের মধ্যে কোনো কানাডিয়ান নেতার এই প্রথম চীন সফরটি আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি "নতুন যুগের" সূচনা করেছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের মতে, এই কূটনৈতিক পরিবর্তন অটোয়ার বৈদেশিক নীতিতে "কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন" বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে। সফরের শেষ পর্যায়ে মার্ক কার্নি কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি (CATL) এবং চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (CNPC) মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথেও বৈঠক করেন। সেখানে তারা জ্বালানি এবং বিনিয়োগ খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।



