২০২৬ ডাভোস ফোরামে প্রেসিডেন্ট Javier Milei-এর ভাষণ
দাভোস ২০২৬: আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই-এর ভাষণের বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা
লেখক: gaya ❤️ one
২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি, দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। ১৬:৩০ থেকে ১৭:০০ (সিইটি) পর্যন্ত স্থায়ী এই বিশেষ অধিবেশনটির শিরোনাম ছিল 'স্পেশাল অ্যাড্রেস বাই হাভিয়ের মিলেই, প্রেসিডেন্ট অফ আর্জেন্টিনা'। তার এই বক্তব্যে মূলত ভূ-অর্থনীতি এবং সমসাময়িক রাজনীতির জটিল সমীকরণগুলো উঠে আসে, যেখানে তিনি নৈতিকতা, মুক্ত বাজার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
এবারের দাভোস সফরে মিলেই-এর সুর আগের বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা নমনীয় হলেও তাত্ত্বিক যুক্তিতে ছিল আপসহীন। তিনি অনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের পক্ষে তার অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে টমাস সোয়েল, মারে রথবার্ড, অ্যাডাম স্মিথ, হ্যান্স-হারম্যান হোপ এবং হেসুস হুয়ের্তা ডি সোটোর মতো প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের তত্ত্বের অবতারণা করেন। একইসাথে তার বক্তব্যে বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাইবেলের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ফুটে ওঠে।
মিলেই তার ভাষণের শুরুতেই একটি জোরালো ঘোষণা দেন—'ম্যাকিয়াভেলি মৃত' (Machiavelli is dead)। এর মাধ্যমে তিনি রাজনীতি এবং নৈতিকতার চিরাচরিত বিভাজনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি যুক্তি দেন যে, রাজনীতিকে নৈতিকতা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। হেসুস হুয়ের্তা ডি সোটোর সূত্র ধরে তিনি বলেন, যা নৈতিকভাবে সঠিক তা কখনো অকার্যকর হতে পারে না এবং যা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর তা কখনো অন্যায্য হতে পারে না।
পুঁজিবাদের নৈতিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিলেই মুক্ত উদ্যোক্তা ব্যবস্থাকে বিশ্বের সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি সমাজতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করে টমাস সোয়েলের একটি উক্তি স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে বলা হয়েছে যে সমাজতন্ত্র শুনতে খুব আকর্ষণীয় মনে হলেও এর বাস্তবায়ন সবসময়ই ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভেনিজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।
ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক পতনের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, সেখানে জিডিপি প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার এবং একটি 'নার্কো-স্বৈরশাসন' বা মাদক-নির্ভর একনায়কতন্ত্রের উত্থান কীভাবে একটি সমৃদ্ধ দেশকে ধ্বংস করতে পারে, তা তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন। এটি ছিল সমাজতান্ত্রিক নীতির ব্যর্থতার বিরুদ্ধে তার অন্যতম প্রধান যুক্তি।
জন লক-এর দর্শনের ওপর ভিত্তি করে মিলেই প্রাকৃতিক অধিকার এবং ইতিবাচক বা মানুষের তৈরি আইনের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করেন। তিনি মনে করেন, জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার হলো মানুষের মৌলিক ও চিরন্তন অধিকার। তার মতে, রাষ্ট্রীয় আইন যদি এই প্রাকৃতিক অধিকারগুলোকে খর্ব করে, তবে তা অন্যায্য হিসেবে গণ্য হবে।
মিলেই তার বক্তব্যে 'অহিংস নীতি' বা নন-অ্যাগ্রেশন প্রিন্সিপল-এর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, অন্যের জীবন দর্শনের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করাই হলো একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি। এই নীতির মাধ্যমেই সমাজে প্রকৃত শান্তি ও সমৃদ্ধি আসা সম্ভব।
পুঁজিবাদের মধ্যে ন্যায়বিচারের ধারণাটি তিনি রোমান আইনের প্রবক্তা উলপিয়ানের সংজ্ঞার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। উলপিয়ানের মতে, ন্যায়বিচার হলো প্রত্যেককে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়ার একটি স্থায়ী এবং চিরন্তন ইচ্ছা। মিলেই বিশ্বাস করেন যে, ব্যক্তিগত মালিকানা এবং মুক্ত বাজারের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশই এই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একমাত্র পথ।
অর্থনৈতিক দক্ষতার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি অ্যাডাম স্মিথের 'অদৃশ্য হাত' এবং হ্যান্স-হারম্যান হোপের প্যারেটো-অপ্টিমালিটি তত্ত্বের উল্লেখ করেন। তিনি দেখান যে, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই কীভাবে বাজার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পদের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে। এটি পুঁজিবাদের স্থবির বা স্ট্যাটিক দক্ষতার একটি অন্যতম প্রমাণ।
অন্যদিকে, পুঁজিবাদের গতিশীল বা ডায়নামিক দক্ষতার ক্ষেত্রে তিনি উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতা এবং শ্রম বিভাজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। অ্যাডাম স্মিথের পিন ফ্যাক্টরির উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান কীভাবে মূলধন সঞ্চয় এবং প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। ডগলাস নর্থের তত্ত্ব অনুযায়ী, তিনি মনে করেন যে সঠিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনিশ্চয়তা কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
মিলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সহ নতুন ও ক্রমবর্ধমান বাজারগুলোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সেইসব মানুষদের কাজে বাধা না দেওয়া যারা তাদের উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশই উদ্ভাবনের চাবিকাঠি।
আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সাফল্য তুলে ধরে তিনি জানান যে, ২০২৩ সাল থেকে তার সরকার প্রায় ১৩,৫০০টি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর ফলে দেশটির জিডিপির ১৫ শতাংশ ঘাটতি দূর করা সম্ভব হয়েছে। এটি আর্জেন্টিনার অর্থনীতির জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও তার সরকার অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। মিলেই জানান যে, এক সময়কার ৩০০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পাশাপাশি দারিদ্র্যের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে; যা আগে ৫৭ শতাংশ ছিল, তা বর্তমানে ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো তার গৃহীত অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা প্রমাণ করে।
পুঁজিবাদের সাথে নৈতিক মূল্যবোধের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন যে, এই ব্যবস্থাটি ইহুদি-খ্রিস্টান এবং গ্রীক-রোমান ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। আর্জেন্টিনার মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশল সম্পর্কে তিনি একটি প্রবাদ ব্যবহার করে বলেন, 'আমরা মানুষকে মাছ দেওয়ার পরিবর্তে মাছ ধরা শেখাতে শুরু করেছি।' তিনি ডেইড্রে ম্যাকক্লোস্কির 'বুর্জোয়া গুণাবলী'র উল্লেখ করে পুঁজিবাদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
পাশ্চাত্য বিশ্বের প্রতি একটি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে মিলেই বলেন যে, সমাজতন্ত্র এবং 'ওকিজম' (wokeism) এর প্রভাবে পশ্চিমের সভ্যতা আজ হুমকির মুখে। তিনি ওকিজমকে এক ধরণের 'ভণ্ড সমাজতন্ত্র' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে তিনি আশাবাদী যে, বিশ্ব এখন জেগে উঠতে শুরু করেছে এবং আমেরিকা আবারও স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা হয়ে পুরো পাশ্চাত্যকে পথ দেখাবে।
ভাষণের শেষে তিনি তোরাহ-র 'পারশাত বো' (Parshat Bo) থেকে একটি উপমা ব্যবহার করেন। ফেরাউনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কাহিনীকে তিনি স্বাধীনতার যুদ্ধের মেটাফর হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি সতর্ক করেন যে, স্বাধীনতা বিসর্জন দিলে দুর্ভিক্ষ, অন্ধকার এবং মৃত্যুর মতো অভিশাপ নেমে আসে। তিনি তার বিখ্যাত স্লোগান 'স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক, গোল্লায় যাক সব বাধা!' (Long live freedom, damn it) বলে বক্তব্য শেষ করেন।
ভাষণ পরবর্তী এক সাক্ষাৎকারে মিলেই চীনকে একটি 'চমৎকার ব্যবসায়িক অংশীদার' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান যে, ২০২৫ সালে চীনে আর্জেন্টিনার রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ব্রাজিলের পর চীনই আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক বাজার। তিনি স্পষ্ট করেন যে, চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার সাথে আমেরিকার সাথে বন্ধুত্বের কোনো বিরোধ নেই।
মিলেই-এর মতে, আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিশ্বের সকল দেশের সাথে উন্মুক্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রয়োজন। তিনি বলেন, 'যারা আমাদের পণ্য কিনতে আগ্রহী, তাদের সবার সাথেই আমরা ব্যবসা করতে চাই। এটি আমাদের টিকে থাকা এবং সমৃদ্ধির প্রশ্ন।' তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করলেও মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে তার অবস্থান পরিষ্কার করেন।
আর্জেন্টিনার মুদ্রা পেসো এবং মুদ্রানীতি সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, আর্জেন্টিনা এখনই পেসোকে পুরোপুরি মুক্তভাবে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। বর্তমানে নিয়ন্ত্রিত মুদ্রানীতি এবং রিজার্ভ বৃদ্ধিই সবচেয়ে নিরাপদ পথ বলে তিনি মনে করেন, যাতে সাধারণ মানুষ বাজারের অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
পরিশেষে, মিলেই বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনীতি এবং প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি আবারও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কমানোর ওপর জোর দিয়ে বলেন যে, যারা বিশ্বকে সুন্দর করছে তাদের পথে বাধা না হওয়াই সরকারের প্রধান কাজ। আমেরিকার স্বাধীনতার আদর্শের পুনর্জাগরণকে তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন।
