পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের মাধ্যমে মার্ক কার্নির নিরঙ্কুশ বিজয় কানাডার পররাষ্ট্রনীতির ভঙ্গি রাতারাতি বদলে দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার পরিবর্তে অটোয়া এখন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার শক্ত অবস্থান থেকে ওয়াশিংটনের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের পরপরই সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি আধুনিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি কেবল কোনো সদিচ্ছার প্রকাশ নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ঝুঁকিগুলো পর্যালোচনা করে দীর্ঘ প্রস্তুতির পর গ্রহণ করা একটি বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ।
ব্যাংক অফ কানাডা এবং ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের সাবেক গভর্নর মার্ক কার্নি বরাবরই মনে করেন যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই হলো সার্বভৌমত্বের মূল শর্ত। এখন পার্লামেন্টে বিরোধী দলের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীলতা না থাকায় তিনি এমন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন, যা সংখ্যালঘু সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
উভয় দেশের মধ্যকার এই বাণিজ্য কেবল কোটি কোটি ডলারের পরিসংখ্যান নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক বাস্তবচিত্র। ওন্টারিওর গাড়ি তৈরির কারখানা, অ্যালবার্টার তেল খনি কিংবা প্রেইরি অঞ্চলের কৃষক—সবাই মার্কিন বাজারের গতির ওপর নির্ভরশীল। যেকোনো নতুন শুল্ক আরোপ বড় কর্পোরেশনের চেয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অনেক বেশি দ্রুত এবং সরাসরি প্রভাব ফেলে।
রয়টার্স জানিয়েছে, কানাডার বর্তমান কৌশল বর্তমান ইউএসএমসিএ (USMCA) চুক্তির বিধানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে যাতে কোনো নতুন বাণিজ্য বাধা তৈরি না হয়, তার আগেই একটি স্থিতিশীল নিয়মাবলী নিশ্চিত করতে চাইছে অটোয়া। একটি মধ্যম শক্তির দেশ হিসেবে এটি আগাম সতর্কতামূলক কূটনীতির একটি অনন্য উদাহরণ।
ঐতিহাসিকভাবে কানাডা সব সময়ই একটি ছোট অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালন করে এসেছে, যেখানে নিজেদের মর্যাদা ও কর্মসংস্থান রক্ষায় তাদের অসামান্য উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় দিতে হতো। বর্তমান পরিস্থিতি সেই চিরচেনা প্রেক্ষাপটকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো: কার্নির হাতে এখন এমন সংসদীয় শক্তি রয়েছে যা তার অনেক পূর্বসূরিরই ছিল না।
'বাণিজ্য-অর্থনৈতিক উদ্যোগের' মতো গালভরা শব্দের আড়ালে মূলত বেতন, পেনশন এবং আঞ্চলিক বাজেটের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল মানবিক স্বার্থ লুকিয়ে থাকে। যখন একটি দেশের জিডিপির দুই শতাংশ অন্য একটি দেশের বাজারে প্রবেশের ওপর নির্ভর করে, তখন আলোচনা আর নিছক ভূ-রাজনীতি থাকে না, বরং তা সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়।
কার্নি স্পষ্টতই আশা করছেন যে এই অভ্যন্তরীণ ঐক্য কানাডাকে কেবল মার্কিন উদ্যোগের মোকাবিলা করতেই নয়, বরং খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ডিজিটাল বাণিজ্যের মতো নিজস্ব এজেন্ডাগুলো প্রস্তাব করতেও সাহায্য করবে। তবে ওয়াশিংটন তার কথা শুনতে কতটা প্রস্তুত, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।



