ইরানে বিক্ষোভের তীব্রতা বৃদ্ধি: দমন-পীড়ন ও আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে নিহতের সংখ্যা ২৫০০ ছাড়িয়েছে
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজপথগুলো উত্তাল হয়ে উঠেছে। যা শুরুতে একটি অর্থনৈতিক অসন্তোষ হিসেবে দেখা দিয়েছিল, তা এখন এক বিশাল গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এই বিক্ষোভ দমনে নজিরবিহীন কঠোরতা এবং শক্তি প্রয়োগ করছে। মূলত জাতীয় মুদ্রার চরম অবমূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ার ফলে সৃষ্ট তীব্র অর্থনৈতিক সংকটই এই গণবিক্ষোভের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
বর্তমানে এই বিক্ষোভের আগুন ইরানের প্রায় ১৮০টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি এখন আর কেবল অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা বর্তমান রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ৮ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে কঠোর ইন্টারনেট ব্লকেড বা তথ্যপ্রযুক্তি অবরোধ আরোপ করেছে, যা এখনও অনেক অঞ্চলে কার্যকর রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা HRANA-এর ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সহিংসতায় অন্তত ২,৫৭১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই তালিকায় ২,৪০৩ জন সাধারণ বিক্ষোভকারী এবং ১৪৭ জন সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। তবে সিবিএস নিউজ ও বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মীদের মতে, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ১২,০০০ থেকে ২০,০০০ এর মধ্যে হতে পারে।
ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই টালমাটাল পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা জনসমক্ষে স্বীকার করেছেন এবং জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করতে মাসিক প্রায় ৭ ডলার সমমূল্যের একটি নামমাত্র আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে একই সাথে তিনি এই অস্থিরতার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মতো "বিদেশি শত্রুদের" হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কোনো প্রকার নমনীয়তা প্রদর্শনে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং বিক্ষোভকারীদের 'ভণ্ড' ও 'ধ্বংসাত্মক' হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর বিপরীতে, নির্বাসিত বিরোধী নেতা রেজা পাহলভি দেশটির সেনাবাহিনীকে সাধারণ মানুষের পক্ষ নিতে এবং শ্রমিকদের দেশব্যাপী ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের এই চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ওপর বিশ্ব সম্প্রদায় তীক্ষ্ণ নজর রাখছে এবং সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ করেছেন এবং অবিলম্বে ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করার দাবি জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্ক ইরানি কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে বলেছেন যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের 'সন্ত্রাসী' হিসেবে তকমা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ঘোষণা করেছেন যে, যারা এই নৃশংস দমন-পীড়নের সাথে জড়িত, তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, যে শাসনব্যবস্থা কেবল বন্দুকের নলের ওপর টিকে থাকতে চায়, তার পতন অনিবার্য।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বলেছেন যে "সাহায্য আসছে" এবং তিনি বিক্ষোভকারীদের সরকারি দপ্তরগুলো দখল করে নেওয়ার প্ররোচনা দিয়েছেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র "অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ" গ্রহণ করবে। এর জবাবে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী মিশন বলেছে যে, ওয়াশিংটন আসলে ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের একটি অজুহাত তৈরি করার চেষ্টা করছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই ১২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে যে, যেসব দেশ ইরানের সাথে বাণিজ্য অব্যাহত রাখবে, তাদের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ফাতিমে আমান মনে করেন, যদি শাসকগোষ্ঠীর উচ্চপর্যায়ে কোনো বড় ফাটল না ধরে, তবে এই ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ হিতে বিপরীত হতে পারে এবং বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে আরও সংহত করতে পারে।
বর্তমানে ইরানের পরিস্থিতি এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ১২ জানুয়ারি ফরেক্স মার্কেটে ইরানি রিয়ালের মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড ৯৯৪,০৫৫-এ নেমে এসেছে, যা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে। ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের পর বর্তমান ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আর কখনও এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি। এই সংকটের প্রভাব কেবল ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; যদি এই অস্থিরতার কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে এক ভয়াবহ বৈশ্বিক মন্দার সৃষ্টি করতে পারে।
6 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Deutsche Welle
Al Jazeera Online
Clarin
Merz s'attend à une fin prochaine du régime iranien
Le Figaro
OPB
JNS.org
The Times of Israel
Wikipedia
Wikipedia
WAFA
CBS News
Modern Diplomacy
JNS.ORG
Wikipedia, la enciclopedia libre
RTVE.es
The Guardian
The Jerusalem Post
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
