দাভোস ২০২৬-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা থেকে প্রাচুর্যের যুগে উত্তরণ

লেখক: gaya ❤️ one

২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, দাভোস। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) এবারের বার্ষিক সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এমনকি বৈশ্বিক বাণিজ্য শুল্ক এবং ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেও ছাপিয়ে গেছে এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই এখন আর কেবল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয়, বরং বর্তমানের এক অনিবার্য বাস্তবতা যা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন রূপ দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ইতিমধ্যে ১.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তাদের ব্যবসায়িক মডেলে এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে নিছক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায় থেকে বেরিয়ে বাস্তবায়নের পথে হাঁটা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কৌশল এবং আমূল সাংগঠনিক পরিবর্তন।

দাভোসে এআই নিয়ে আলোচনার মূল সুর ছিল এর ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। আইএমএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা উল্লেখ করেন যে, এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩.৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও এআই জিডিপিতে অতিরিক্ত ০.১ থেকে ০.৮ শতাংশ যোগ করার ক্ষমতা রাখে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "আমরা আর আগের অবস্থায় নেই," কারণ এআই মধ্যবিত্তের কর্মসংস্থান কমিয়ে বৈষম্য বাড়াতে পারে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে এআই ব্যবহারের হার ২৫ শতাংশ হলেও আফ্রিকায় তা মাত্র ১০-১৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা একটি গভীর প্রযুক্তিগত বিভাজন বা 'ডিফিউশন ডিভাইড' তৈরি করছে।

"এআই স্কেলিং: এখন শুরু হচ্ছে কঠিন পথ" শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে অ্যাকসেঞ্চার, ভিসা এবং সৌদি আরামকোর শীর্ষ নির্বাহীরা অংশ নেন। সেখানে আলোচনা হয় যে, পাইলট প্রকল্পের যুগ এখন শেষ এবং এখন সময় 'এজেন্টিক এআই'-এর, যা সরবরাহ শৃঙ্খল, অর্থায়ন এবং নির্মাণ খাতের মতো জটিল কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম। অ্যাকসেঞ্চারের জুলি সুইট জোর দিয়ে বলেন যে, মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মপ্রক্রিয়া পুনর্গঠন ছাড়া এই প্রযুক্তি সফল হবে না। ম্যাককিনসের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত ছিল ইলন মাস্ক এবং ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিংকের মধ্যকার কথোপকথন। দাভোসে প্রথমবারের মতো উপস্থিত হয়ে মাস্ক ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যেই টেসলার 'অপ্টিমাস' রোবটগুলো সর্বত্র দেখা যাবে। তিনি দারিদ্র্যমুক্ত এক প্রাচুর্যের পৃথিবীর স্বপ্ন দেখান যেখানে বার্ধক্যকেও জয় করা সম্ভব হবে। তবে তিনি বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মার্কিন সৌরবিদ্যুৎ শুল্কের সমালোচনা করেন, যা এআই-এর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎসকে ব্যয়বহুল করে তুলছে।

এআই খাতের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস মনে করেন এজিআই বা সাধারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসতে আরও ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে। এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং ইউরোপের জন্য এটিকে একটি "জীবনে একবারই আসা সুযোগ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং অবকাঠামোতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা বা 'রেফারি' ছাড়া এই প্রতিযোগিতা কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের আধিপত্যকেই আরও জোরালো করবে।

পরিশেষে, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম তাদের "প্রুফ ওভার প্রমিজ" প্রতিবেদনে দেখিয়েছে কীভাবে এআই ইতিমধ্যে ৩০টি দেশ এবং ২০টি শিল্প খাতে বাস্তব সুফল বয়ে আনছে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জ্বালানি খাত—সবখানেই এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান। 'মাইন্ডস' (MINDS) প্রোগ্রামের মাধ্যমে এমন কিছু অগ্রগামীদের চিহ্নিত করা হয়েছে যারা রোগ নির্ণয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে এআই ব্যবহার করছেন। তবে বিনিয়োগের সম্ভাব্য বুদবুদ এবং সৃজনশীল কাজে এআই ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি, যা আগামী দিনগুলোতে নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

34 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।