ব্রিটিশ ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গৃহ সংস্কার উদ্যোগ: ১৫ বিলিয়ন পাউন্ডের 'ওয়ার্ম হোমস প্ল্যান' চালু

সম্পাদনা করেছেন: an_lymons

যুক্তরাজ্যের আবাসন খাতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের উচ্চাভিলাষী 'ওয়ার্ম হোমস প্ল্যান' (Warm Homes Plan) চালু করেছে। ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড বাজেটের এই প্রকল্পটি দেশের ইতিহাসে আবাসন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের সবচেয়ে বড় সরকারি উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ বসতবাড়ির জ্বালানি দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা।

সরকারের এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো চলতি দশকের শেষ নাগাদ অন্তত ১০ লাখ পরিবারকে জ্বালানি দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই উদ্যোগকে একটি 'যুগান্তকারী মুহূর্ত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, প্রতিটি ব্রিটিশ পরিবারের জন্য একটি উষ্ণ ও আরামদায়ক ঘর নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক অঙ্গীকারের অংশ।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে:

  • নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সরাসরি ও বিশেষায়িত সহায়তা প্রদান;
  • দেশের সকল নাগরিকের জন্য এই প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণের সার্বজনীন সুযোগ;
  • ভাড়া দেওয়া বাড়িগুলোর ক্ষেত্রে নতুন এবং কঠোর জ্বালানি মানদণ্ড প্রবর্তন।

জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিভাগ (DESNZ) এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করছে। মূলত জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং জ্বালানি সংকটের সরাসরি মোকাবিলা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ঘরবাড়িতে তাপ নিরোধক বা ইনসুলেশন স্থাপনের হার আশঙ্কাজনকভাবে ৯০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছিল। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ জ্বালানি মূল্যের অস্থিতিশীলতার মুখে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিলেন।

এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকার 'ফিউচার হোমস স্ট্যান্ডার্ড' (Future Homes Standard) প্রবর্তন করছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি নতুন নির্মিত বাড়িতে সৌর প্যানেল স্থাপন করা বাধ্যতামূলক হবে। এটি কেবল পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ খরচ কমাতেও সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জ্বালানি মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এই প্রকল্পটিকে জ্বালানি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় সংগ্রাম হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১৫ বিলিয়ন পাউন্ডের এই বিশাল তহবিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বণ্টন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে:

  • ৫ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ রাখা হয়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য, যারা ১২,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত মূল্যের সৌর প্যানেল এবং ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমসহ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আধুনিকায়ন প্যাকেজ পাবেন।
  • মধ্যবিত্ত ও অন্যান্য বাড়ির মালিকদের জন্য সরকার শূন্য বা অত্যন্ত কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করছে, যা সৌর প্যানেল বা হিট পাম্প স্থাপনে ব্যয় করা যাবে।
  • যারা হিট পাম্প কিনতে আগ্রহী, তাদের জন্য ৭,৫০০ পাউন্ডের একটি সার্বজনীন অনুদান বা গ্রান্টের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদে সৌর প্যানেল থাকা বাড়ির সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় তিনগুণ করা। এটি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।

পুরো কার্যক্রমের সুষ্ঠু সমন্বয়ের জন্য 'ওয়ার্ম হোমস এজেন্সি' (Warm Homes Agency) নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করা হচ্ছে। এই সংস্থাটি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজকে একীভূত করবে যাতে কাজের পুনরাবৃত্তি না হয় এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমে। বিশেষ করে স্থানীয় মেয়ররা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে এই আধুনিকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবেন।

১০ বছর মেয়াদী এই বিশাল কর্মসূচির অর্থনৈতিক প্রভাবও হবে সুদূরপ্রসারী। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অর্জিতব্য কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা হলো:

  • ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি দক্ষতা এবং পরিচ্ছন্ন হিটিং খাতে প্রায় ১,৮০,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
  • বেসরকারি খাতের বিনিয়োগসহ এই প্রকল্পের মোট আর্থিক বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৮ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে।

যুক্তরাজ্য সরকার হিট পাম্পের সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের বিনিয়োগ তিনগুণ বাড়িয়ে ৯০ মিলিয়ন পাউন্ডে উন্নীত করেছে। এই বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো দেশে স্থাপিত হিট পাম্পের অন্তত ৭০ শতাংশ যেন স্থানীয়ভাবে যুক্তরাজ্যেই উৎপাদিত হয়। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় শিল্প খাত আরও শক্তিশালী হবে।

পরিশেষে, 'ওয়ার্ম হোমস প্ল্যান' কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়, বরং এটি যুক্তরাজ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। এর সফল বাস্তবায়ন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বমঞ্চে ব্রিটেনের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।

81 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • gov.uk

  • Mirage News

  • edie.net

  • Transport + Energy

  • ESG Today

  • GOV.UK

  • Construction Enquirer News

  • Big Issue

  • GOV.UK

  • Construction Enquirer News

  • Money Saving Expert

  • Solar Power Portal

  • Kensa

  • Construction Enquirer News

  • GOV.UK

  • Transport + Energy

  • The Eco Experts

  • Solar Power Portal

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।