উন্নত ভূ-তাপীয় ব্যবস্থা: পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের নতুন মেরুদণ্ড

সম্পাদনা করেছেন: an_lymons

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক সিমুলেশন গবেষণায় দেখা গেছে যে, উন্নত ভূ-তাপীয় ব্যবস্থা (Enhanced Geothermal Systems বা EGS) বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের গতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করতে পারে। স্ট্যানফোর্ড স্কুল অফ সাসটেইনেবিলিটি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের অধ্যাপক মার্ক জ্যাকবসনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি বিশ্বের ১৫০টি দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত মডেল তৈরি করেছে। গবেষণার মূল নির্যাস হলো, জাতীয় গ্রিডে EGS-এর অন্তর্ভুক্তি বায়ু, সৌর এবং ব্যাটারি শক্তির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়, অথচ এটি জ্বালানির সামগ্রিক খরচকে জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী রাখে।

বেস লোড বা মূল বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে EGS ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট সুবিধাগুলো এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যদি মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ এই উন্নত ভূ-তাপীয় ব্যবস্থা থেকে মেটানো হয়, তবে স্থলভিত্তিক বায়ুকলের প্রয়োজনীয়তা ১৫ শতাংশ এবং সৌরবিদ্যুতের চাহিদা ১২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমে, যার প্রয়োজনীয়তা ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এছাড়া জমির ব্যবহার ০.৫৭ শতাংশ থেকে কমে ০.৪৮ শতাংশে নেমে আসে, যা বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর জন্য একটি বড় স্বস্তি। জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় এই মডেলে প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয় হয়, তবে ভূ-তাপীয় উপাদান যোগ করলে বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সামাজিক ব্যয়ের কথা বিবেচনা করলে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির এই বিকল্পগুলো সামগ্রিক সামাজিক ক্ষতি প্রায় ৯০ শতাংশ কমাতে সক্ষম।

প্রচলিত ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সাধারণত আগ্নেয়গিরি বা টেকটোনিক প্লেটের সক্রিয় অঞ্চলের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু উন্নত ভূ-তাপীয় প্রযুক্তি বা EGS মাটির ৩ থেকে ৮ কিলোমিটার গভীরে থাকা উত্তপ্ত শিলার তাপকে কাজে লাগানোর সুযোগ করে দেয়। এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো মাটির গভীরে উচ্চ চাপে তরল পদার্থ প্রবেশ করিয়ে কৃত্রিম জলাধার তৈরি করা, যা থেকে উৎপন্ন বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তেল ও গ্যাস শিল্প থেকে ধার করা সিন্থেটিক ডায়মন্ড ড্রিল বিটের মতো আধুনিক খনন প্রযুক্তি এই প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ ও দ্রুততর করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে ফারভো এনার্জি (Fervo Energy) তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে খনন কাজের সময় প্রায় ৭০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

বর্তমানে EGS-এর ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং বাণিজ্যিকীকরণের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অফ ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (BLM) ইউটা অঙ্গরাজ্যের বিভার কাউন্টিতে ফারভো এনার্জির ২ গিগাওয়াট ক্ষমতার 'কেপ স্টেশন' (Cape Station) নামক একটি বিশাল প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রকল্পটি ২০২৬ সালের মধ্যে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে তার পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত এই অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে ২০২৭ সালের মধ্যেই উন্নত ভূ-তাপীয় ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গড় বিদ্যুৎ মূল্যের সাথে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে চলে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন।

'সেল রিপোর্টস সাসটেইনেবিলিটি' (Cell Reports Sustainability) নামক বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উন্নত ভূ-তাপীয় ব্যবস্থা ভবিষ্যতে জ্বালানি ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে। এটি বায়ু বা সৌরশক্তির মতো পরিবর্তনশীল উৎসগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখতে নিরবচ্ছিন্ন এবং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। অধ্যাপক জ্যাকবসন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বায়ু ও সৌর শক্তির সাথে EGS-এর সমন্বয় ন্যূনতম পরিবেশ দূষণে সর্বোচ্চ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তবে এই প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসারের আগে ভূ-কম্পনজনিত ঝুঁকি বা সিসমিক রিস্ক যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।

5 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • tun.com

  • Reddit

  • Stanford Report

  • Engineering News-Record

  • Geothermal Rising

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।