দাভোস-২০২৬: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা ও বিশ্ব অর্থনীতির নতুন চ্যালেঞ্জ
সম্পাদনা করেছেন: an_lymons
২০২৬ সালের ১৯ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই বছরের সম্মেলনে বিশ্বনেতা ও বিশেষজ্ঞদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জ্বালানি নিরাপত্তা। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির চাহিদা যেভাবে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে এই বিষয়টি বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের ফলে এই চ্যালেঞ্জ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বর্তমান যুগে জ্বালানি চাহিদার এই উল্লম্ফনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অভাবনীয় বিকাশ। এআই প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা এবং তাদের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল সংখ্যক ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন, তা বর্তমান বৈশ্বিক অবকাঠামোর ওপর এক নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চাপ সামলাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জ্বালানি খাতের এই সংকট মোকাবিলায় কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা নিয়ে দাভোসে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ক্রিসেন্ট পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী এবং ডানা গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিদ জাফর এই বিষয়ে একটি চমকপ্রদ তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান যে, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এই বিশাল অংকের বিনিয়োগ ছাড়া ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব বলে তিনি সতর্ক করেন।
মজিদ জাফরের মতে, এই বিনিয়োগ মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ব্যয় করা অত্যন্ত জরুরি:
- নতুন এবং টেকসই জ্বালানি উৎসের ব্যাপক উন্নয়ন ও বিস্তার ঘটানো;
- বিদ্যমান বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা বা ইলেকট্রিক গ্রিডগুলোর আধুনিকায়ন করা;
- অত্যাধুনিক এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা।
বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ১,০০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা (TWh) ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে হলে একটি বাস্তবসম্মত এবং সর্বজনীন জ্বালানি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব বলে সম্মেলনে বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ধারণা করছে যে, ২০২৬ সালের মধ্যেই ডেটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ১,০৫০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে। যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তবে ডেটা সেন্টারগুলো বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি ভোক্তা দেশগুলোর তালিকায় পঞ্চম স্থানে চলে আসবে, যা একটি অভাবনীয় পরিবর্তন।
অন্যদিকে, এনার্জি ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষকরাও প্রায় একই ধরনের পূর্বাভাস দিয়েছেন। তাদের মতে, ২০২৬ সালের মধ্যে এই চাহিদার পরিমাণ ১,০০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় দাঁড়াবে। উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালে এই চাহিদার পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৬০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ডেটা সেন্টারগুলোর জ্বালানি চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে।
এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সমাধানে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মজিদ জাফর উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এই অঞ্চলটি জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য একটি আদর্শ ক্ষেত্র। তিনি জানান যে, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে।
তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রায় ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়ক বিনিয়োগ প্রয়োজন। জাফর আরও গুরুত্বারোপ করেন যে, ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে তারাই সফল হবে যারা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে এবং একই সাথে তাদের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে আধুনিকায়ন করতে সক্ষম হবে। এই দুইয়ের সমন্বয়ই হবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি।
ফোরামের মূল আলোচনার পাশাপাশি মজিদ জাফর এবং অ্যাডনক (ADNOC)-এর আপস্ট্রিম সিইও মুসাব্বেহ আল কাবি একটি বিশেষ সভার আয়োজন করেন, যার নাম ছিল 'এনার্জি লিডারস ব্রেকফাস্ট'। এই প্রাতঃরাশ সভায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি খাতের নেতারা একত্রিত হয়েছিলেন। সভার মূল প্রতিপাদ্য ছিল "নতুন জ্বালানি এজেন্ডা: প্রবেশাধিকার, স্থিতিস্থাপকতা এবং এআই"।
এই বিশেষ সভায় অংশগ্রহণকারীরা আলোচনা করেন যে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে জ্বালানি ব্যবস্থাগুলোকে কীভাবে বিবর্তিত করা যায়। সভার প্রধান নির্যাস ছিল এই যে, ডেটা সেন্টারগুলো এখন এআই-ভিত্তিক অর্থনীতির নতুন 'শিল্প বোঝা' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই এই নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গ্রিড আধুনিকায়ন এবং টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ডেটা সেন্টারগুলোর চব্বিশ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করার জন্য এমন জ্বালানি উৎস প্রয়োজন যা সব সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম। তবে বর্তমানের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসগুলো, যেমন সৌর বা বায়ু শক্তি, অনেক সময় আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পর্যাপ্ত স্থিতিশীলতা দিতে পারে না। এই সমস্যা সমাধানে দাভোসে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব উঠে এসেছে:
- পারমাণবিক শক্তির পুনর্জাগরণ: সুইডেনের মতো অনেক দেশ এখন পারমাণবিক শক্তিকে একটি পরিচ্ছন্ন এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে।
- প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা: আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়নের (আইজিইউ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক গ্যাস একটি নমনীয় এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য জ্বালানি উৎস হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর। এটি একদিকে যেমন ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সক্ষম, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
63 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Zawya.com
Oil & Gas Middle East
McKinsey & Company
ZAWYA
MIT News
Petroleum Economist
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
