২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাইনো (Rhino) লেবেল প্রগ্রেসিভ রকের ইতিহাসের অন্যতম সাহসী এবং বিতর্কিত অ্যালবাম 'টেলস ফ্রম টপোগ্রাফিক ওশানস' (Tales From Topographic Oceans)-এর একটি সুপার ডিলাক্স এডিশন প্রকাশ করতে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি সাধারণ পুনঃপ্রকাশ নয়, বরং ইয়েস (Yes) ব্যান্ডের সেই মহাজাগতিক এবং আধ্যাত্মিক সুরের মূলে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য প্রচেষ্টা, যেখানে সংগীত মহাকাশ, আত্মা এবং সময়ের ভাষায় কথা বলে।
১৯৭৩ সালের ৭ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে মুক্তি পাওয়া ইয়েস-এর এই ষষ্ঠ স্টুডিও অ্যালবামটি ছিল ড্রামার অ্যালান হোয়াইট (Alan White)-এর সাথে ব্যান্ডের প্রথম কাজ, যিনি বিল ব্রুফোর্ড (Bill Bruford)-এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। সেই সময়ে এই অ্যালবামটি ছিল ব্যান্ডটির জন্য এক অজানা পথে পা বাড়ানোর মতো একটি বিশাল পদক্ষেপ, যা তাদের সংগীতের পরিধিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
অ্যালবামটির মূল ভাবনা এসেছিল ফ্রন্টম্যান জন অ্যান্ডারসন (Jon Anderson)-এর আধ্যাত্মিক অন্বেষণ থেকে। পরমহংস যোগানন্দ (Paramahansa Yogananda)-এর 'অটোবায়োগ্রাফি অফ এ যোগী' (Autobiography of a Yogi) বইয়ের একটি টীকা তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, যেখানে হিন্দু দর্শনের চারটি শাস্ত্রের কথা উল্লেখ ছিল। এই শাস্ত্রগুলো প্রাচীন ভারতের জ্ঞানের ভাণ্ডার, যা মহাবিশ্বের নিয়ম এবং মানুষের চেতনার পথ নির্দেশ করে।
অ্যালবামের চারটি দীর্ঘ কম্পোজিশন এই চারটি শাস্ত্রীয় পথের প্রতিনিধিত্ব করে:
- ধর্ম (Dharma) — মহাজাগতিক শৃঙ্খলা এবং সঠিক কর্ম;
- অর্থ (Artha) — সমাজ এবং বস্তুগত জগতের কাঠামো;
- কাম (Kāma) — প্রেম, সৃজনশীলতা এবং কামনার শক্তি;
- মোক্ষ (Mokṣa) — মুক্তি এবং অহংবোধের সীমানা অতিক্রম করা।
এইভাবে পুরো অ্যালবামটি একটি সংগীতময় মণ্ডলে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভিনাইলের চারটি দিক চেতনার চারটি ভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা প্রদান করে। এটি কেবল গানের সংকলন নয়, বরং ধ্যানের একটি মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে যা শ্রোতাকে এক গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রায় নিয়ে যায়।
মুক্তির সময় 'টেলস ফ্রম টপোগ্রাফিক ওশানস' সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক বিভাজন তৈরি করেছিল। কেউ এর দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার সমালোচনা করেছিলেন, আবার কেউ এর অভূতপূর্ব সাহসিকতার প্রশংসা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও, অ্যালবামটি ব্রিটিশ চার্টের শীর্ষে পৌঁছেছিল, যুক্তরাষ্ট্রে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেছিল এবং 'গোল্ড' স্ট্যাটাস অর্জন করেছিল।
মরগান স্টুডিওতে (Morgan Studios) যুক্তরাজ্যের প্রথম ২৪-ট্র্যাক মেশিনের সাহায্যে এই অ্যালবামের রেকর্ডিং করা হয়েছিল, যা ব্যান্ডটিকে এক বিশাল ধ্বনি-মহাকাশ তৈরির সুযোগ করে দেয়। যদিও কিবোর্ডিস্ট রিক ওয়েকম্যান (Rick Wakeman) পরবর্তীতে এর দৈর্ঘ্য ও ব্যাপ্তি নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন, তবুও সেই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনই অ্যালবামটিকে একটি কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।
নতুন এই সুপার ডিলাক্স সংস্করণে থাকছে ১২টি সিডি, ২টি এলপি এবং ব্লু-রে ডিস্ক, যার মধ্যে রয়েছে:
- স্টিভেন উইলসন (Steven Wilson)-এর করা নতুন রিমিক্স এবং ডলবি অ্যাটমস (Dolby Atmos) সংস্করণ;
- ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে ম্যানচেস্টার এবং ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে জুরিখের অপ্রকাশিত কনসার্ট রেকর্ডিং;
- রজার ডিন (Roger Dean)-এর একটি বিশেষ লিথোগ্রাফ, যার শিল্পকর্ম ইয়েস-এর ভিজ্যুয়াল পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
স্টিভেন উইলসন প্রায় তিন বছর ধরে এই রিমিক্সের কাজ করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল অ্যালবামটিকে আধুনিক করা নয়, বরং এর বিশালতা বজায় রেখে এর অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলা। এটি ইয়েস-এর অন্যান্য কাজ যেমন 'দ্য ইয়েস অ্যালবাম', 'ফ্রাজাইল', 'ক্লোজ টু দ্য এজ' এবং 'রিলেয়ার'-এর সাথে উইলসনের দীর্ঘদিনের সম্পর্কেরই একটি ধারাবাহিকতা।
আজকের দ্রুতগতির যুগে 'টেলস ফ্রম টপোগ্রাফিক ওশানস' আমাদের ধীরস্থিরভাবে শোনার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। 'দ্য রিভিলিং সায়েন্স অফ গড (ড্যান্স অফ দ্য ডন)'-এর মতো মহাকাব্যিক সৃষ্টিগুলো কেবল খণ্ডিতভাবে শুনে বিচার করা সম্ভব নয়; এগুলো শ্রোতার পূর্ণ মনোযোগ এবং সময় দাবি করে।
২০২৬ সালের এই পুনঃপ্রকাশ কেবল নস্টালজিয়া নয়, বরং এটি সংগীতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার এক নতুন আমন্ত্রণ। ইয়েস আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কখনও কখনও সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে গভীর জলে ডুব দিয়ে অতীতে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।



