দক্ষিণ কোরিয়ার বক্স অফিসে শীর্ষে ঐতিহাসিক ড্রামা 'দ্য কিংস ওয়ার্ডেন', ইয়ংওলে পর্যটনের জোয়ার

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

২০২৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ঐতিহাসিক সিনেমা 'দ্য কিংস ওয়ার্ডেন' (The King's Warden)। গত ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ মুক্তি পাওয়ার পর থেকে সিনেমাটি ইতিমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে ১১ মিলিয়নেরও বেশি টিকিট বিক্রির রেকর্ড গড়েছে। গত দুই বছরের মধ্যে এটিই প্রথম চলচ্চিত্র যা ১০ মিলিয়নের গণ্ডি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে, যা কোরীয় চলচ্চিত্র শিল্পে হলিউড ব্লকবাস্টারের এক বিলিয়ন ডলার আয়ের সমতুল্য এক বিশাল অর্জন। সিনেমাটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত পরিচালক চ্যাং হান-জুন, যিনি এর আগে 'ব্রেক আউট' (২০০২) এবং 'রিবউন্ড' (২০২৩)-এর মতো প্রশংসিত কাজের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।

ওন্ডা ওয়ার্কস এবং বি.এ. এন্টারটেইনমেন্টের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এবং শোবক্সের পরিবেশনায় মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটি ১৫শ শতাব্দীর ক্ষমতাচ্যুত সম্রাট রাজা দানজং-এর করুণ ভাগ্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ১৪৫৭ সালে রাজার সেই ঐতিহাসিক নির্বাসনের সময়কালকে একজন গ্রাম প্রধানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যিনি রাজাকে প্রতিকূল সময়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সিনেমাটিতে গ্রাম প্রধানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শক্তিমান অভিনেতা ইউ হে-জিন এবং তরুণ রাজার ভূমিকায় দেখা গেছে জনপ্রিয় বয়-ব্যান্ড 'ওয়ানা ওয়ান'-এর সদস্য পার্ক জি-হুনকে। এই দুই তারকার অনবদ্য রসায়ন এবং অভিনয় দক্ষতা সমালোচকদের কাছ থেকে উচ্চ প্রশংসা কুড়িয়েছে।

এই সিনেমার অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক সাফল্য গ্যাংওয়ান প্রদেশের ইয়ংওল কাউন্টির পর্যটন খাতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। রাজা দানজং-এর নির্বাসন স্থলের সাথে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত এই এলাকাটিতে বর্তমানে পর্যটকদের ভিড় উপচে পড়ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত ছংনিয়ংপো (নির্বাসন স্থল) এবং জংনং রাজকীয় সমাধি পরিদর্শনে আসা পর্যটকের সংখ্যা ১১১,১২৮ জন ছাড়িয়ে গেছে। এর বিপরীতে, গত বছর এই ১০০,০০০ পর্যটকের মাইলফলক স্পর্শ করতে জুন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। নদীবেষ্টিত মনোরম উপদ্বীপ ছংনিয়ংপো এবং ২০০৯ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া জংনং বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সিনেমাটির সাংস্কৃতিক প্রভাব কেবল বক্স অফিস বা পর্যটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কিয়োবো বুকস্টোরের দেওয়া তথ্যমতে, সিনেমাটি মুক্তির পর থেকে 'অ্যানালস অফ দ্য জোসন ডাইনেস্টি' বা জোসন রাজবংশের ইতিহাস সম্পর্কিত বইপত্রের বিক্রি আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি লি জে-মিয়ং এই অভাবনীয় সাফল্যের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। দীর্ঘ দুই বছর পর কোনো সিনেমা ১০ মিলিয়নের মাইলফলক স্পর্শ করায় তিনি এর গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপ্রধান মন্তব্য করেছেন যে, এটি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অসাধারণ সৃজনশীলতা, শক্তিশালী গল্প বলার ক্ষমতা এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের এক সম্মিলিত ফসল। তিনি আরও জানান যে, দেশের সৃজনশীল ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

পরিচালক চ্যাং হান-জুন এই বিশাল সাফল্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, তিনি দর্শকদের কাছ থেকে এত বড় সাড়া পাওয়ার কথা কল্পনাও করেননি। আগামী ২৪ থেকে ২৬ এপ্রিল ইয়ংওলে অনুষ্ঠিতব্য ৫৯তম দানজং সাংস্কৃতিক উৎসবে তিনি সশরীরে উপস্থিত থেকে একটি বিশেষ বক্তৃতা প্রদান করবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। অভিনেতা পার্ক জি-হুনও ইয়ংওলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে এই উৎসবের প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক পরামর্শদাতা কিম সুং-নামের মতে, সিনেমার মূল উপজীব্য—একটি অভ্যুত্থানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন—বর্তমান দর্শকদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের সামরিক আইন জারির ঘটনার প্রেক্ষাপটে। সব মিলিয়ে, 'দ্য কিংস ওয়ার্ডেন' কেবল জাতীয় ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখার সুযোগই করে দেয়নি, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নয়নেও এক শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

15 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Independent

  • Screen Daily

  • The Korea Times

  • AsianWiki

  • Korea JoongAng Daily

  • The Korea Times

এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।