সুইডিশ আমলা গুস্তাভ এংজেল: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাজার হাজার ইহুদি রক্ষার কাহিনী নিয়ে নতুন চলচ্চিত্র

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

সুইডিশ জীবনীমূলক ড্রামা ফিল্ম 'Den svenska länken' (দ্য সুইডিশ লিঙ্ক) সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে, যা গুস্তাভ এংজেলের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সরকারি কর্মকর্তা যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকার সময়ে ইহুদি জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় এক অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যুদ্ধের পুরোটা সময় এংজেল সুইডিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঐতিহাসিকদের ধারণা অনুযায়ী, তার এবং তার দলের দৃঢ় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ ইহুদির প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল। এই চলচ্চিত্রের পরিচালক তেরেসা আলবেক এবং মার্কাস ওলসন, যারা যৌথভাবে এর চিত্রনাট্যও লিখেছেন, নাৎসি আমলাতন্ত্রের কঠোরতার বিরুদ্ধে এই নীরব বীরত্বের গল্পটি বলতে গিয়ে মানবিকতা ও সূক্ষ্ম হাস্যরসের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

ছবিটিতে দয়ালু এবং বিনয়ী কর্মকর্তা এংজেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা হেনরিক ডরসিন। তিনি এমন একজন সাধারণ আমলার চরিত্রে প্রাণদান করেছেন যিনি হলোকাস্টের ভয়াবহতার প্রতি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতাকে সাহসের সাথে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি গোথেনবার্গ চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ৬ ফেব্রুয়ারি এটি সুইডেনের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে নেটফ্লিক্স (Netflix) প্ল্যাটফর্মে এটি বিশ্বব্যাপী দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এই চলচ্চিত্রটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সুইডেনের বিতর্কিত ভূমিকার প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত স্তরে সরকারি কর্মকর্তাদের ইতিবাচক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিশেষ আলোকপাত করেছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে সুইডিশ সরকার নাৎসি জার্মানি থেকে আসা শরণার্থীদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তবে ১৯৪২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এক নাটকীয় মোড় আসে যখন লাটভিয়ান শরণার্থী হিলেল স্টর্চ অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে ইহুদিদের শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে এংজেলকে সরাসরি অবহিত করেন। তার সহকর্মী, বিশেষ করে নতুন কর্মী রুথ ফোগেল (চরিত্রে সিসেলা বেন) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এংজেলের দল নিরপেক্ষ সুইডেনে আশ্রয়প্রার্থী নরওয়েজীয় এবং ডেনিশ ইহুদিদের জন্য সক্রিয়ভাবে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ শুরু করে। তারা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে আইনি ফাঁকফোকর এবং 'সংযত ভদ্রতা' ব্যবহার করে নাৎসিদের আমলাতান্ত্রিক বাধাগুলো অতিক্রম করার কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

যদিও সুইডেন সেই সময় জার্মানিকে কোনোভাবে উত্তেজিত না করার জন্য কঠোর নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করছিল, তবুও ইহুদিদের ভিসার আবেদনগুলো শুরুতে ঝুলিয়ে রাখার একটি অলিখিত নীতি ছিল। কিন্তু ১৯৪২ সালের শেষের দিকে যখন নরওয়েজীয় ইহুদিদের আউশউইৎজে (Auschwitz) নির্বাসন শুরু হয়, তখন সেই অমানবিক ঘটনাটি সুইডিশ নীতি পরিবর্তনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এংজেল, যিনি ১৯৩৮ সালে ইভিয়ান সম্মেলনেও অংশ নিয়েছিলেন, তার উদ্যোগে বা সমর্থনে শুরু হওয়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো কার্ল ইভান ড্যানিয়েলসন এবং পার অ্যাঙ্গারের মতো সুইডিশ কূটনীতিকদের ১৯৪৪ সালে বুদাপেস্টে ইহুদিদের সুরক্ষার আইনি ক্ষমতা প্রদান করে। এই সাহসী পদক্ষেপগুলো যুদ্ধের সেই সংকটময় মুহূর্তে নিরপেক্ষ সুইডেনকে একটি 'নৈতিক পরাশক্তি' হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

১০২ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটিতে জোনাস কার্লসন এবং মারিয়ান মর্ক সহ একঝাঁক দক্ষ অভিনেতা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ছবিটির মূল লক্ষ্য হলো গুস্তাভ এংজেলের বিনয়ী অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী অবদানকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলা। এই কাহিনীটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, এংজেলের মতো ব্যক্তিগত নাগরিক অবস্থান এবং নৈতিক দৃঢ়তা কীভাবে বিশাল মানবিক গুরুত্ব বহন করতে পারে। এটি হাঙ্গেরিতে রাউল ওয়ালেনবার্গের সুপরিচিত উদ্ধার অভিযানের সমান্তরালে এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায় উন্মোচন করে। ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি নেটফ্লিক্সে ছবিটির মুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সুইডিশ ইতিহাসের এই স্বল্প পরিচিত কিন্তু গৌরবময় দিকটিকে বিশ্বব্যাপী মানুষের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Guardian

  • Tidningen Vi

  • Holocaust Encyclopedia

  • YouTube

  • YouTube

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।