নিউট্রন তারার সংঘর্ষ GRB 230906A-এর বিশ্লেষণ: মহাবিশ্বের ভারী মৌলসমূহের রহস্য উন্মোচন

সম্পাদনা করেছেন: Uliana Soloveva

GRB 230906A একটি বিস্ময়কর মহাজাগতিক গল্প উন্মোচন করে। মিলিত হওয়া গ্যালাক্সিগুলোর ভিতরে নিউট্রন স্টারগুলোর সংঘর্ষের ফলে সোনা ও ভারী উপাদান তৈরি হয়।

কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশের সুদূর প্রান্তে ঘটে যাওয়া দুটি নিউট্রন তারার এক প্রলয়ঙ্কারী সংঘর্ষের ঘটনা বিজ্ঞানীদের সামনে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক গভীর রহস্য উন্মোচন করেছে। পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষক দল সোনা এবং প্ল্যাটিনামের মতো মহাজাগতিক ভারী মৌলগুলোর উৎপত্তি সম্পর্কে মৌলিক নতুন তথ্য প্রদান করেছেন। এই মহাজাগতিক বিপর্যয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি ২০২৬ সালের ১০ মার্চ প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স'-এ একটি গবেষণাপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাটি মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং মৌলসমূহের বিবর্তন বুঝতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

এই বিশেষ মহাজাগতিক ঘটনাটি 'GRB 230906A' নামে পরিচিতি পেয়েছে, যা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাসার 'ফার্মি' স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা একে একটি সংক্ষিপ্ত গামা-রশ্মি বিস্ফোরণ বা শর্ট গামা-রে বার্স্ট (GRB) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন। এই ধরনের বিস্ফোরণগুলো মহাকাশের অন্যতম শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত, যা ক্ষণস্থায়ীভাবে পুরো গ্যালাক্সির সম্মিলিত উজ্জ্বলতাকেও ম্লান করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। দুটি অতি-ঘন নিউট্রন তারা যখন সর্পিল গতিতে একে অপরের কাছে এসে একীভূত হয়, তখন সেখান থেকে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তা 'আর-প্রসেস' বা দ্রুত নিউট্রন ক্যাপচার পদ্ধতির মাধ্যমে ভারী মৌলসমূহ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে।

গবেষণার প্রধান লেখক সিমোন ডিকিয়ারা এবং পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সহ-লেখক জেন চার্লটন এই বিস্ফোরণের সঠিক উৎস নির্ধারণের জন্য নাসার 'চন্দ্র' এক্স-রে টেলিস্কোপ এবং 'হাবল' স্পেস টেলিস্কোপের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, GRB 230906A একটি অস্পষ্ট বামন গ্যালাক্সিতে অবস্থিত, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই গ্যালাক্সিটি আবার একটি বৃহত্তর গ্যালাক্সি গুচ্ছের অংশ, যারা বর্তমানে একটি সক্রিয় একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংঘর্ষের অবস্থানটি ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক, কারণ এটি একটি 'টাইডাল টেইল' বা জোয়ারের লেজের অভ্যন্তরে ঘটেছিল—যা মূলত গ্যালাক্সিগুলোর প্রবল মহাকর্ষীয় টানের ফলে তৈরি হওয়া তারা এবং গ্যাসের একটি দীর্ঘ ও পাতলা প্রবাহ।

ডক্টর ডিকিয়ারা এই পরিবেশ বিশ্লেষণ করে প্রস্তাব করেছেন যে, গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে এই ধরনের জোয়ারের মিথস্ক্রিয়া নতুন নক্ষত্র গঠনকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া নিউট্রন তারাগুলোই শেষ পর্যন্ত একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। গবেষক জেন চার্লটন গুরুত্বারোপ করে বলেন যে, এই আবিষ্কারটি ধ্বংসের মাধ্যমে সৃজনশীলতার এক বিরল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আমাদের পৃথিবীতে বিদ্যমান মূল্যবান সোনা মূলত এই ধরনের প্রলয়ঙ্কারী বিস্ফোরণ থেকেই তৈরি হয়েছে। এই গবেষণাটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈজ্ঞানিক রহস্যের সমাধান করতে সাহায্য করে যে, কেন কিছু গামা-রশ্মি বিস্ফোরণ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে না ঘটে প্রান্তসীমায় ঘটে এবং কীভাবে ভারী মৌলগুলো গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে বহু দূরে ছড়িয়ে পড়ে।

নিউট্রন তারা হলো সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড় কোনো নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর তার অবশিষ্টাংশ বা অতি-সংকুচিত কেন্দ্রস্থল। এই নক্ষত্রগুলো যখন নিজেদের ভারে ধসে পড়ে বিস্ফোরিত হয়, তখন মাত্র ১২ মাইল ব্যাসের একটি অতি-ঘন পিণ্ডে পরিণত হয়, যার ভর আমাদের সূর্যের চেয়েও বেশি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এদের মহাবিশ্বের অন্যতম চরম ও অদ্ভুত বস্তু হিসেবে গণ্য করেন। গবেষক দলের মতে, এই গামা-রশ্মি বিস্ফোরণে অংশ নেওয়া নিউট্রন তারাগুলো মূল সংঘর্ষের প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বছর আগে গ্যালাক্সিক একীভূতকরণের ফলে সৃষ্ট এক নক্ষত্র গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল। এই চূড়ান্ত সংঘর্ষটি কেবল শক্তিশালী গামা-রশ্মিই তৈরি করেনি, বরং নবগঠিত ভারী মৌলগুলোকে মহাকাশের বিশাল শূন্যতায় ছড়িয়ে দিয়েছে।

রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-লেখক ইলিওনোরা ট্রয়া এই ঘটনাটিকে 'সংঘর্ষের ভেতরে সংঘর্ষ' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, শত কোটি বছর আগে গ্যালাক্সিগুলোর আদি সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘের মধ্যেই এই নিউট্রন তারার মিলনটি ঘটেছে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারে নাসার 'সুইফট' টেলিস্কোপসহ আরও বেশ কিছু মহাকাশযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইউরোপীয় রিসার্চ কাউন্সিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থাগুলোর নিরবচ্ছিন্ন অর্থায়ন এবং মহাকাশ গবেষণার উন্নত অবকাঠামো এই ধরনের বৈজ্ঞানিক সাফল্য অর্জনের জন্য অপরিহার্য। এই ধরনের গবেষণা আমাদের অস্তিত্বের মহাজাগতিক শিকড় খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • L'Eco di Bergamo

  • ANSA.it

  • Ansa Tecnologia

  • Penn State University

  • Sci.News

  • Starlust.org

  • InfoOggi

  • Penn State University

  • EurekAlert!

  • Sci.News

  • Midland Daily News

  • NASA

এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।