বিজ্ঞানীরা যারা গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ সংকেত বিশ্লেষণ করছেন তারা দেখতে পেয়েছেন যে নিউট্রন স্টার এবং ব্ল্যাক হোল মিলনের ঠিক আগে একটি এলিপটিক্যাল ওরবিটে পরিক্রম করছিল।
২০২৬ সালে বৈজ্ঞানিক মহলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সংকেত GW200105-এর প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ এবং এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। LIGO এবং Virgo পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের যৌথ প্রচেষ্টায় শনাক্ত করা এই সংকেতটি মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৯১০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে একটি কৃষ্ণগহ্বর এবং একটি নিউট্রন তারার সঙ্ঘর্ষ ও মিলনের প্রথম অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। এই প্রলয়ঙ্কারী মহাজাগতিক ঘটনার ফলস্বরূপ একটি নতুন কৃষ্ণগহ্বর সৃষ্টি হয়েছে, যার ভর সূর্যের ভরের প্রায় ১৩ গুণ বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অ্যাস্ট্রোনমি-তে উদ্ভাবিত একটি অত্যন্ত উন্নত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ মডেল ব্যবহার করে GW200105-এর তথ্য পুনরায় বিশ্লেষণ করার ফলে এই বৈজ্ঞানিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। প্যাট্রিসিয়া শ্মিট এবং তার গবেষক দল এই বিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগ করে বস্তু দুটির চূড়ান্ত মিলনের পূর্ব মুহূর্তের কক্ষপথের প্যারামিটারগুলো অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই বিশ্লেষণ প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেছে যে, তাদের কক্ষপথটি ছিল উপবৃত্তাকার বা 'এক্সেন্ট্রিক', যা এই ধরণের বাইনারি সিস্টেমের ক্ষেত্রে প্রচলিত বৃত্তাকার কক্ষপথের ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। এই গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল ১১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে বিখ্যাত 'দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স'-এ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষক প্যাট্রিসিয়া শ্মিট এবং তার সহকর্মীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, কক্ষপথের এই উচ্চমাত্রার উপবৃত্তাকার প্রকৃতি মূলত একটি জটিল গতিশীল গঠন প্রক্রিয়ার সরাসরি ফলাফল। এটি জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, সিস্টেমটি গঠনের সময় বাইরের কোনো মহাকর্ষীয় প্রভাব, যেমন পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো নক্ষত্র বা সিস্টেমে তৃতীয় কোনো সঙ্গীর উপস্থিতি সক্রিয় ছিল। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গেরাইন্ট প্র্যাটেন মন্তব্য করেছেন যে, এই উপবৃত্তাকার আকৃতি সিস্টেমটির একটি বিশৃঙ্খল এবং ঘটনাবহুল ইতিহাসের দিকে নির্দেশ করে। কক্ষপথের এই নতুন জ্যামিতিক ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীদের আগের সেই হিসাবগুলোকে সংশোধন করার সুযোগ করে দিয়েছে, যা মূলত বৃত্তাকার কক্ষপথের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। পূর্ববর্তী গণনায় কৃষ্ণগহ্বরের ভরকে মাত্র ৯ সৌর ভরের সমান এবং নিউট্রন তারার ভরকে ২ সৌর ভরের বেশি ধরা হয়েছিল, যা বর্তমান তথ্যের আলোকে পরিবর্তিত হয়েছে।
নতুন এই গাণিতিক মডেলটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে যে কৃষ্ণগহ্বরটির প্রকৃত ভর ১৩ সৌর ভর এবং এটি ৯৯.৫ শতাংশের বেশি নিশ্চিত বিশ্বাসের সাথে বৃত্তাকার কক্ষপথের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে। বায়েসিয়ান পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই উচ্চমাত্রার নির্ভুলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি চরম বাইনারি সিস্টেমগুলোর গঠন প্রক্রিয়া বর্ণনাকারী তাত্ত্বিক মডেলগুলোর আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। মাদ্রিদের স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গঞ্জালো মোরাস উল্লেখ করেছেন যে, এটি একটি বড় প্রমাণ যে সমস্ত 'কৃষ্ণগহ্বর-নিউট্রন তারা' জোড়ার উৎপত্তি বা উৎস অভিন্ন নয়। ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাভিটেশনাল ফিজিক্সের বিশেষজ্ঞসহ আন্তর্জাতিক গবেষক দলটি প্রথমবারের মতো এই সিস্টেমে কক্ষপথের উপবৃত্তাকার প্রকৃতি এবং উল্লেখযোগ্য স্পিন প্রিসেশনের অনুপস্থিতি একই সাথে পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রিসেশনের এই অভাব প্রমাণ করে যে কক্ষপথের এই বক্রতা বা এক্সেন্ট্রিসিটি সিস্টেমটি গঠনের প্রাথমিক ধাপেই নির্ধারিত হয়েছিল।
ভবিষ্যতে উপবৃত্তাকার বা এক্সেন্ট্রিক মিলনের এই ধরণের আরও তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হলে জ্যোতির্পদার্থবিদরা একটি সমৃদ্ধ পরিসংখ্যান তৈরি করতে পারবেন। এর মাধ্যমে ঘন নক্ষত্রমন্ডলী বা গ্লোবুলার ক্লাস্টারের মতো পরিবেশে গতিশীল মিথস্ক্রিয়ার ফলে ঠিক কত শতাংশ সিস্টেম জন্ম নেয়, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। এটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, যেখানে ভবিষ্যতের মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণগুলোর সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যার জন্য কক্ষপথের এই উপবৃত্তাকার প্রকৃতি বা এক্সেন্ট্রিসিটি বিবেচনা করা এখন থেকে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।