VLT টেলিস্কোপটি সরাসরি অবলোকনের মাধ্যমে তরুণ সূর্য-জাতীয় নক্ষত্র WISPIT 2-এর ডিস্কে দ্বিতীয় বড় প্রোটোপ্ল্যানেটের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশ বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে WISPIT 2 নামক একটি তরুণ নক্ষত্র ব্যবস্থায় দ্বিতীয় একটি গ্রহের সক্রিয় গঠনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ এই যুগান্তকারী ঘোষণাটি প্রদান করা হয়, যেখানে নতুন এই গ্রহটিকে WISPIT 2c হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই আবিষ্কারের ফলে WISPIT 2 এখন PDS 70-এর পাশাপাশি দ্বিতীয় এমন একটি পরিচিত নক্ষত্র ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পেল, যেখানে একই সাথে দুটি গ্রহের সরাসরি গঠন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। 'দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স'-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি আমাদের সৌরজগতের প্রাথমিক বিকাশের পর্যায়গুলোর একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করছে।
এই সিস্টেমে প্রথম আবিষ্কৃত গ্রহটি ছিল WISPIT 2b, যা একটি বিশাল গ্যাস দানব এবং এর ভর আমাদের বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। ২০২৫ সালে এই গ্রহটি প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে নব-নিশ্চিত WISPIT 2c গ্রহটি তার নক্ষত্রের অনেক বেশি কাছে অবস্থিত—এটি WISPIT 2b-এর তুলনায় প্রায় চার গুণ কম দূরত্বে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, WISPIT 2c-এর ভর বৃহস্পতির ভরের প্রায় ৮ থেকে ১২ গুণের মধ্যে হতে পারে। এই সমগ্র সিস্টেমটির বয়স মাত্র ৫ মিলিয়ন বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অফ গ্যালওয়ের পিএইচডি গবেষক এবং এই গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ক্লোয়ি ললর (Chloe Lawlor) উল্লেখ করেছেন যে, WISPIT 2 আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের অতীত ইতিহাস দেখার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্বচ্ছ মাধ্যম প্রদান করছে।
এই নক্ষত্র ব্যবস্থার বিশেষ গুরুত্বের কারণ হলো এর বিশাল এবং সুগঠিত প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিস্ক। PDS 70 সিস্টেমের তুলনায় এর ডিস্কটি অনেক বেশি সুবিন্যস্ত এবং এতে স্পষ্ট ফাঁক ও বলয় লক্ষ্য করা যায়। এই গঠনগুলো মূলত সেখানে তৈরি হওয়া গ্রহগুলোর মহাকর্ষীয় প্রভাবের ফল, যারা চারপাশের ডিস্ক থেকে উপাদান সংগ্রহ করে নিজেদের আকার বৃদ্ধি করছে। এই সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়েছে ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO)-র অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। বিশেষ করে ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ (VLT)-এর SPHERE স্পেকট্রোগ্রাফ এবং VLT ইন্টারফেরোমিটার (VLTI)-এর GRAVITY+ যন্ত্রটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নক্ষত্রের এত কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও গ্রহটিকে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে GRAVITY+ এর উন্নত প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
দূরত্বের হিসেবে WISPIT 2b গ্রহটি নক্ষত্র থেকে প্রায় ৫৭ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (AU) দূরে অবস্থান করছে, যেখানে WISPIT 2c-এর অবস্থান মাত্র ১৪ AU দূরত্বে। WISPIT 2c-এর বর্ণালী বিশ্লেষণে কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা তরুণ গ্যাস দানব গ্রহগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মূল নক্ষত্র WISPIT 2 পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৩৭ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং এর ভর আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় ১.০৮ গুণ। নক্ষত্রটি বর্তমানে তার বিবর্তনের প্রাক-নিউক্লিয়ার ফিউশন পর্যায়ে রয়েছে। গবেষকরা আরও ধারণা করছেন যে, এই সিস্টেমে তৃতীয় একটি গ্রহের অস্তিত্ব থাকতে পারে। ডিস্কের বাইরের অংশে একটি অগভীর ফাঁক দেখে মনে করা হচ্ছে সেখানে শনি গ্রহের ভরের সমান কোনো বস্তু থাকতে পারে। ২০৩০ সালের দিকে এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ (ELT) চালু হলে এই সম্ভাব্য গ্রহটির সরাসরি ছবি তোলা সম্ভব হতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের লাইডেন অবজারভেটরি এবং জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্সের গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি সম্পন্ন করেছেন। এই সাফল্য প্রমাণ করে যে বর্তমান সময়ের ভূ-পৃষ্ঠভিত্তিক টেলিস্কোপগুলো নবজাতক নক্ষত্র ব্যবস্থার গতিশীল প্রক্রিয়াগুলো বিশ্লেষণ করতে কতটা সক্ষম। WISPIT 2-এর পর্যবেক্ষণগুলো এই অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণ সরবরাহ করে যে গ্যাস দানব গ্রহগুলো নক্ষত্র থেকে অনেক দূরেও গঠিত হতে পারে। বিশাল গ্রহগুলোর বৃদ্ধি এবং আমাদের সৌরজগতের মতো অন্যান্য সিস্টেমের বিবর্তন সংক্রান্ত তত্ত্বগুলো যাচাই করার ক্ষেত্রে এই গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম।