একজন শিল্পীর রেন্ডারিংটি বৃহৎ স্পাইরাল গ্যাল্যাক্সি NGC 1365কে একটি ছোট সহচর গ্যালাক্সির সাথে সংঘর্ষ ও মিলনের মুহূর্তে প্রদর্শিত হয়।
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো মিল্কিওয়ে বা আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের বাইরে 'রাসায়নিক প্রত্নতত্ত্ব' (chemical archaeology) পদ্ধতিটি বিস্তারিতভাবে প্রয়োগ করেছেন। এই যুগান্তকারী গবেষণার মাধ্যমে 'বহির্জাগতিক প্রত্নতত্ত্ব' নামক একটি সম্পূর্ণ নতুন ক্ষেত্রের উদ্ভব হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৩ মার্চ 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি' (Nature Astronomy) সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় সর্পিল গ্যালাক্সি NGC 1365-এর গত ১২ বিলিয়ন বছরের বিবর্তনীয় ইতিহাস পুনর্গঠন করা হয়েছে। মহাজাগতিক গ্যাসে সংরক্ষিত রাসায়নিক 'আঙুলের ছাপ' বিশ্লেষণ করে এই অসাধ্য সাধন করা সম্ভব হয়েছে। হার্ভার্ড অ্যান্ড স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের (CfA) পরিচালক লিসা কিউলি এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তিনি গুরুত্বারোপ করেন যে, আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সির সীমানা ছাড়িয়ে অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে রাসায়নিক প্রত্নতত্ত্বের এত সূক্ষ্ম প্রয়োগ এর আগে কখনো হয়নি।
NGC 1365 স্পাইরাল গ্যালак্সির ছয়টি ছবি, TYPHOON সার্ভে-র অংশ হিসেবে তৈরি স্পেকট্রোফোটোমেট্রিক ডেটা অ্যারে থেকে প্রাপ্ত।
এই গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে টাইফুন (TYPHOON) নামক একটি বিশেষ জরিপের মাধ্যমে। এতে লাস কাম্পানাস অবজারভেটরির আইরিন দু পন্ট (Irénée du Pont) টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হয়েছে, যা নক্ষত্র গঠনকারী অঞ্চলগুলোর বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত উচ্চমানের রেজোলিউশন নিশ্চিত করেছে। গবেষক দলটি NGC 1365 গ্যালাক্সির ৪৫০০টিরও বেশি স্পেশিয়াল পিক্সেল বা স্প্যাক্সেলে (spaxels) অক্সিজেনের বিন্যাস মানচিত্র তৈরি করেছেন। এখানে অক্সিজেনকে একটি প্রধান নির্দেশক বা 'ট্রেসার' হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, কারণ এটি বিশাল ভরের নক্ষত্রগুলোর অভ্যন্তরে দ্রুত উৎপন্ন হয় এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। অক্সিজেনের এই মানচিত্রগুলো একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি বা 'পালিম্পসেস্ট'-এর মতো কাজ করে, যেখানে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে গ্যালাক্সিদের একীভূত হওয়ার প্রতিটি ঘটনা নিজস্ব অনন্য চিহ্ন রেখে গেছে।
গবেষণার ফলাফল থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, NGC 1365 শুরুতে একটি ক্ষুদ্র সিস্টেম হিসেবে তার যাত্রা শুরু করেছিল। এর কেন্দ্রীয় অঞ্চলটি মহাজাগতিক সময়ের হিসেবে খুব দ্রুত গঠিত হয় এবং প্রায় ১১.৯ থেকে ১২.৫ বিলিয়ন বছর আগে বিভিন্ন বামন গ্যালাক্সির সাথে একীভূত হওয়ার ফলে এটি প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেনে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এর বাইরের সর্পিল বাহুগুলো পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তুর ধীরগতির সংযোজন বা অ্যাক্রেশনের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। এই জটিল রাসায়নিক সংকেতগুলো সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য গবেষকরা ইলস্ট্রিস (Illustris) প্রকল্পের কসমোলজিক্যাল সিমুলেশন, বিশেষ করে TNG0053 মডেলের সাথে প্রাপ্ত তথ্যের তুলনা করেছেন। ভলকার স্প্রিঙ্গেল এবং মার্ক ভোগেলসবারগার-এর মতো বিজ্ঞানীদের অবদানে তৈরি এই প্রকল্পে প্রায় ২০,০০০টি সিমুলেটেড গ্যালাক্সি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা গবেষণার ফলাফলকে আরও নিখুঁত করেছে।
গ্যালাকটিক প্রত্নতত্ত্ব পদ্ধতিটি ইতিপূর্বে মূলত মিল্কিওয়ের গঠন এবং এর ইতিহাস বোঝার জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই নতুন গবেষণাটি জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফোরনাক্স ক্লাস্টারে (Fornax Cluster) অবস্থিত এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ১৮.১ মেগাপারসেক দূরে থাকা NGC 1365 গ্যালাক্সিটিকে বেছে নেওয়ার পেছনে একটি বিশেষ কৌশল কাজ করেছে। এটি পৃথিবীর সাপেক্ষে প্রায় সমান্তরাল বা 'ফেস-অন' অবস্থানে থাকায় এর ডিস্কের একটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও উচ্চ-রেজোলিউশন ছবি পাওয়া সম্ভব হয়েছে, যা উপাত্ত সংগ্রহের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। এই গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলগুলো বর্তমান মহাজাগতিক মডেলকে আরও জোরালো সমর্থন দেয়, যা অনুযায়ী মিল্কিওয়ের মতো বিশাল সর্পিল গ্যালাক্সিগুলো অসংখ্য ছোট প্রতিবেশী গ্যালাক্সির সাথে একীভূত হওয়ার মাধ্যমেই বর্তমান আকার ধারণ করে।
হার্ভার্ডের জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং CfA-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী লার্স হার্নকুইস্ট এই গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, এটি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করে কীভাবে সিমুলেটেড জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রক্রিয়াগুলো কোটি কোটি বছর ধরে গ্যালাক্সিগুলোর রূপান্তর ঘটায়। NGC 1365-এর ওপর এই পদ্ধতির সফল প্রয়োগ গ্যালাক্সির বিবর্তন সংক্রান্ত তুলনামূলক গবেষণার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারবেন: আমাদের মিল্কিওয়ের বিবর্তনীয় পথ কি একটি সাধারণ প্রক্রিয়া, নাকি এটি মহাবিশ্বের অন্যান্য বিশাল সর্পিল সিস্টেমগুলোর মধ্যে অনন্য? ইলস্ট্রিস সিমুলেশনের সাথে সংগৃহীত তথ্যের সফল সামঞ্জস্য NGC 1365-এর বৃদ্ধির সময়রেখাকে এক অনন্য নির্ভরযোগ্যতা প্রদান করেছে, যা প্রমাণ করে যে গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রভাগ প্রাথমিক পর্যায়েই সমৃদ্ধ হয়েছিল এবং এর বাইরের কাঠামোটি সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে।