রাশিয়ার St. Petersburg, Russia-এর ওপর একটি বিরল বায়ুমন্ডলীয় প্রদর্শনী সম্প্রতি দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, রাতের আকাশে একাধিক চাঁদের মতো দেখাচ্ছিল।
সম্প্রতি রাতের আকাশে এক অনন্য এবং বিস্ময়কর বায়ুমণ্ডলীয় আলোক বিভ্রম বা অপটিক্যাল ফেনোমেনন পরিলক্ষিত হয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে 'প্যারাসেলিনি' (paraselene) বা সাধারণ মানুষের কাছে 'মুন ডগস' নামে পরিচিত। এই বিরল মহাজাগতিক দৃশ্যে রাতের আকাশে মূল চাঁদের পাশে আরও কয়েকটি উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব বা নকল চাঁদ ঝুলে থাকতে দেখা যায়, যা দর্শকদের মনে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অসাধারণ দৃশ্যটি মূলত চরম শীতল আবহাওয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা যখন মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, তখনই এই ধরনের আলোকচ্ছটা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ভিত্তি তৈরি হয়।
এই “চার চাঁদ” প্রভাবটি paraselene; হেক্সাগোনাল বরফ ক্রিস্ট্যালগুলো ছোট প্রিজমের মতো আচরণ করে, চাঁদের আলোকে নির্দিষ্ট কোণে (~২২°) বাঁকিয়ে দেয়।
এই দৃশ্যমান চমৎকারিত্বটি মূলত চাঁদের আলোর সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের সূক্ষ্ম বরফকণার এক জটিল ও নিখুঁত ভৌত মিথস্ক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত হয়। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, যখন চাঁদের আলো উচ্চ-উচ্চতার মেঘমালায় ভাসমান অনুভূমিকভাবে বিন্যস্ত ষড়ভুজাকৃতি বরফ স্ফটিকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন আলোর প্রতিসরণ বা রিফ্র্যাকশন ঘটে। এই স্ফটিকগুলো প্রকৃতিতে প্রিজমের মতো কাজ করে এবং চাঁদের আলোক রশ্মিকে তার মূল গতিপথ থেকে প্রায় ২২ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে দেয়। এর ফলেই মূল চন্দ্রপিণ্ডের দুই পাশে উজ্জ্বল আলোকবিন্দু বা নকল চাঁদের সৃষ্টি হয় যা দেখতে অনেকটা মূল চাঁদের মতোই মনে হয়। এই বিশেষ ধরনের বরফ স্ফটিকগুলো সাধারণত সিরাস (cirrus) মেঘের স্তরে পাওয়া যায়, যা বায়ুমণ্ডলের এমন উচ্চতায় অবস্থান করে যেখানে তাপমাত্রা সবসময় হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকে।
এই বিশেষ গঠন প্রক্রিয়াটি দিনের বেলায় দেখা যাওয়া 'সান ডগস' বা 'পারহেলিয়া'র (parhelia) সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও, রাতের বেলা 'প্যারাসেলিনি' বা চন্দ্র-প্রতিবিম্বের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। এই উজ্জ্বল আলোকবিন্দুগুলো দৃশ্যমান হওয়ার জন্য উচ্চ আর্দ্রতা, মেঘমুক্ত পরিষ্কার ঊর্ধ্ব-আকাশ এবং পূর্বোক্ত তীব্র শৈত্যের একটি নির্দিষ্ট ও বিরল সংমিশ্রণ প্রয়োজন। এখানে ছয়-পার্শ্ববিশিষ্ট স্ফটিকগুলোর সুনির্দিষ্ট এবং সুশৃঙ্খল বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি এই কণাগুলো আকাশে এলোমেলোভাবে বা অগোছালোভাবে অবস্থান করে, তবে আলোর বিচ্ছুরণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি পায় না, যার ফলে এমন উজ্জ্বল ও স্পষ্ট নকল চাঁদ গঠিত হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বায়ুমণ্ডলীয় আলোক বিজ্ঞানের এই ধরনের ঘটনাগুলো বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান এবং ক্ষণস্থায়ী তথ্যভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি ঊর্ধ্ব ট্রপোস্ফিয়ার এবং নিম্ন স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের গঠনগত উপাদান এবং বায়ুর অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদান করে। এই ধরনের প্রতিটি ঘটনার সঠিক সময়, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রার তথ্য নথিভুক্ত করার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিদরা বরফ স্ফটিকের ধরণ এবং তাদের বিন্যাস সম্পর্কে উন্নত গাণিতিক মডেল তৈরি করতে সক্ষম হন। বিভিন্ন গবেষণা নির্দেশ করে যে, পাতলা প্লেটের মতো ষড়ভুজাকৃতি স্ফটিকগুলোই পতনের সময় বায়ুগতিবিদ্যার প্রভাবে অনুভূমিকভাবে বিন্যস্ত হওয়ার প্রবণতা দেখায়, যা সরাসরি ২২-ডিগ্রি হ্যালো এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট উজ্জ্বল পার্শ্ব-বিন্দুগুলো তৈরি করতে সহায়তা করে।
এই বিশেষ আলোক প্রদর্শনীটি কতটা বিরল তা এর প্রয়োজনীয় পরিবেশগত শর্তাবলি থেকেই বোঝা যায়। মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে স্থায়ী তাপমাত্রা সবসময় সেই উচ্চতায় বজায় থাকে না যেখানে এই বরফ মেঘগুলো অবস্থান করে, বিশেষ করে যখন এর সাথে নিখুঁতভাবে বিন্যস্ত স্ফটিকের উচ্চ ঘনত্বের প্রয়োজন হয়। যদিও আকাশে সাধারণ ২২-ডিগ্রি চন্দ্রবলয় বা লুনার হ্যালো মাঝেমধ্যে দেখা যায়, তবে সুনির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত উজ্জ্বল 'প্যারানথেলিয়া' (paranthelia) তৈরির জন্য স্ফটিকের অনেক বেশি সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও ঘনত্ব প্রয়োজন। এই পর্যবেক্ষণটি মূলত প্রাকৃতিক বায়ুমণ্ডলীয় লেন্সের ওপর স্নেলের প্রতিসরণ সূত্রের (Snell's Law of Refraction) একটি জীবন্ত ও বাস্তব প্রতিফলন। এটি জলবায়ুবিদদের জন্য স্থানীয় চরম শৈত্যপ্রবাহ এবং এর ফলে সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।