একটি ‘প্রীবায়োটিক জেলকে শুরুবিন্দু হিসেবে’ ধরে রাখার ধারণাটি সারফেসে সংযুক্ত জেল ম্যাট্রিক্সে জীবনের উদ্ভবের সম্ভাবনাকে বিবেচনা করে।
পৃথিবীতে প্রাণের উৎস কি প্রিবায়োটিক জেল? নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক দল সম্প্রতি 'প্রিবায়োটিক জেল-ফার্স্ট' নামক একটি যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক ধারণা উপস্থাপন করেছেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রাণের আদিম সূচনা কোনো স্বতন্ত্র কোষের ভেতরে নয়, বরং পাথরের উপরিভাগে লেগে থাকা সান্দ্র এবং জেলজাতীয় পদার্থের স্তরে ঘটেছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ChemSystemsChem-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি অ্যাবায়োজেনেসিস বা নির্জীব বস্তু থেকে প্রাণের উৎপত্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে দেখার আহ্বান জানায়। এখানে একটি ভৌত ম্যাট্রিক্স কীভাবে প্রাথমিক রাসায়নিক জটিলতা তৈরির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
জাপান, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গঠিত এই আন্তর্জাতিক গবেষক দলে হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টনি জেড জিয়া (Tony Z. Jia) সহ-নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের এই দলটি দাবি করেছে যে, এই আদিম জেলগুলো অনেকটা আধুনিক অণুজীবীয় বায়োফিল্মের মতো কাজ করত, যা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণসত্তাকে প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে। এগুলো প্রাথমিক রাসায়নিক বিবর্তনের জন্য একটি সুরক্ষিত এবং অত্যন্ত ঘনীভূত পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। গবেষকদের মতে, পাথরের গায়ে লেগে থাকা এই জেলের স্তরগুলো প্রাক-জৈবিক রসায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করেছিল, বিশেষ করে প্রয়োজনীয় অণুর সঠিক ঘনত্ব বজায় রাখা এবং বাইরের বৈরী পরিবেশ থেকে রাসায়নিক উপাদানগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করা।
এই আঠালো এবং অর্ধ-কঠিন কাঠামোগুলো আদিম অণুগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে প্রোটোমেটাবলিজম ও স্ব-প্রতিলিপি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করেছিল। অধ্যাপক জিয়া তার বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রচলিত তত্ত্বগুলো যেখানে শুধুমাত্র জৈব অণুর ওপর আলোকপাত করে, সেখানে তাদের এই নতুন পদ্ধতি জীবনের একেবারে প্রারম্ভিক পর্যায়ে জেলের অপরিহার্য ভূমিকার কথা তুলে ধরে। এই গবেষণায় ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ মালয়েশিয়া (UKM) এবং ইউনিভার্সিটি অফ ডুইসবার্গ-এসেনের বিশেষজ্ঞরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন এবং তারা সফট ম্যাটার কেমিস্ট্রি বা নরম পদার্থের রসায়নের ওপর ভিত্তি করে এই মডেলটি তৈরি করেছেন। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি ইউনিভার্সিটি অফ লিডস, আলেকজান্ডার ফন হুমবোল্ট ফাউন্ডেশন, জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অফ সায়েন্স এবং মিজুহো ফাউন্ডেশনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংস্থাগুলোর আর্থিক ও কৌশলগত সমর্থন লাভ করেছে।
মহাকাশ বিজ্ঞানের বা অ্যাস্ট্রোবায়োলজির প্রেক্ষাপটে এই গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। গবেষকরা অনুমান করছেন যে, পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহেও অনুরূপ কাঠামোর অস্তিত্ব থাকতে পারে, যাকে তারা 'জেনো-ফিল্মস' (Xeno-films) নামে অভিহিত করেছেন। এই ধারণাটি ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধানের প্রচলিত পদ্ধতিকে আরও বিস্তৃত করে, যেখানে শুধুমাত্র পরিচিত জৈব অণু নয়, বরং সুসংগঠিত জেল কাঠামোর সন্ধানের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। গবেষক দলটি এখন ল্যাবরেটরিতে আদিম পৃথিবীর পরিবেশ কৃত্রিমভাবে তৈরি করে এই হাইপোথিসিসটি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে উচ্চ মাত্রার অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রচলিত 'প্রাইমর্ডিয়াল স্যুপ' বা আদিম ঝোল তত্ত্বের সাথে এই নতুন ধারণার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যেখানে আগের তত্ত্বে তরল দ্রবণে প্রাণের স্ব-সংগঠনের কথা বলা হতো, সেখানে 'প্রিবায়োটিক জেল-ফার্স্ট' ধারণাটি পাথরের উপরিভাগের স্থির পরিবেশের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। এই বিশেষ পরিবেশটি প্রথম কোষীয় সীমানা বা মেমব্রেন তৈরির অনেক আগেই রাসায়নিক জটিলতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় সংগঠন এবং সুরক্ষা প্রদান করতে সক্ষম হয়েছিল। অ্যাবায়োজেনেসিস প্রক্রিয়ার সবচেয়ে রহস্যময় এবং জটিল পর্যায়গুলোর একটি ব্যাখ্যা প্রদানে এই তত্ত্বটি বিজ্ঞানের জগতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
উৎসসমূহ
Descopera.ro
Mirage News
SSBCrack News
Sci.News
SciTechDaily
ScienceDaily
