ড্যাম্পিয়ার উপকূলে নতুন কৃত্রিম শৈলশিরা স্থাপন: সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

Dampier Artificial Reef

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ড্যাম্পিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক পরিবেশের সুরক্ষায় এবং জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে এক বিশাল মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে একটি কৃত্রিম শৈলশিরা বা আর্টিফিশিয়াল রিফ তৈরির প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগটি মূলত সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি অঞ্চলের শৌখিন মৎস্যশিকারিদের জন্য একটি নতুন এবং উন্নত কেন্দ্র তৈরির লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এই প্রকল্পের একটি বিশেষ কারিগরি পর্যায় সম্পন্ন হয়। ফুগরো (Fugro) নামক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানটি সমুদ্রের তলদেশে মোট ৪৮টি বিশেষভাবে নকশা করা কংক্রিট মডিউল স্থাপন করেছে। এই মডিউলগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬,০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে একটি বিশাল পানির নিচের কাঠামো গঠন করেছে। এই জটিল এবং সূক্ষ্ম স্থাপনা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে 'ফুগরো এটিভ' (Fugro Etive) নামক একটি বহুমুখী জাহাজ ব্যবহার করা হয়েছিল। ড্যাম্পিয়ার দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত রোজমেরি দ্বীপের নিকটবর্তী অঞ্চলে প্রায় ৩৫ মিটার গভীরতায় এই মডিউলগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছে।

এই প্রকল্পটি বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা শিল্প ও পরিবেশের এক অনন্য সমন্বয় প্রকাশ করে:

  • উডসাইড এনার্জি (Woodside Energy): প্রকল্পের প্রধান সহযোগী এবং জ্বালানি খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান।
  • রেকফিশওয়েস্ট (Recfishwest): একটি শীর্ষস্থানীয় সংস্থা যা পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার শৌখিন মৎস্যশিকারিদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং মাছ ধরার অবকাঠামো উন্নয়নে নিরলস কাজ করে।
  • ফুগরো (Fugro): যারা এই প্রকল্পের সমুদ্রভিত্তিক কারিগরি স্থাপনা এবং প্রকৌশলগত দিকগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছে।

রেকফিশওয়েস্টের পক্ষ থেকে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন কৃত্রিম শৈলশিরাটি ড্যাম্পিয়ার বোট র‍্যাম্প বা নৌকা ছাড়ার প্রধান ঘাট থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরে কৌশলগতভাবে স্থাপন করা হয়েছে। এই কাঠামোর নকশাটি অত্যন্ত আধুনিক এবং এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি কেবল সমুদ্রের তলদেশেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং পানির পুরো স্তরেই সামুদ্রিক প্রাণীদের বিচরণ ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে। এটি সমুদ্রের বিভিন্ন গভীরতায় বসবাসকারী প্রাণীদের জন্য একটি আদর্শ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করবে।

এই কৃত্রিম শৈলশিরা তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা। সময়ের আবর্তনে এই কংক্রিট কাঠামোর গায়ে বিভিন্ন সামুদ্রিক শৈবাল, কোরাল এবং অণুজীবের বসতি গড়ে উঠবে, যা ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের রূপ নেবে। এর ফলে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে মাছের সংখ্যা এবং বৈচিত্র্য উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।

প্রকল্পের নথিপত্র অনুযায়ী, এই নতুন আবাসে বিশেষ করে ম্যাকেরেল (mackerel), ট্রেভালি (trevally), কোবিয়া (cobia) এবং কড (cod) মাছের মতো জনপ্রিয় প্রজাতিগুলোর বংশবৃদ্ধি ও উপস্থিতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, এখানে বড় আকারের পেলাজিক প্রজাতির মাছের আনাগোনাও বৃদ্ধি পাবে বলে বিশেষজ্ঞরা প্রবল সম্ভাবনা দেখছেন। এটি স্থানীয় মৎস্যশিকারিদের জন্য যেমন আনন্দের খবর, তেমনি এটি অঞ্চলের পর্যটন অর্থনীতিতেও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই উদ্যোগটি শিল্প প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এবং আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিরল মেলবন্ধন হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে। এটি কেবল পরিবেশগত ক্ষতির কোনো 'কাগুজে ক্ষতিপূরণ' নয়, বরং মানুষের সরাসরি প্রচেষ্টায় তৈরি একটি বাস্তব এবং দৃশ্যমান পরিবেশগত সম্পদ। এর মাধ্যমে সমুদ্রের সম্পদ যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি সমুদ্রের সাথে মানুষের আত্মিক ও টেকসই সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর এবং প্রাণবন্ত সামুদ্রিক পরিবেশ রেখে যাওয়ার পথে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

6 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Ocean News & Technology

  • Fugro

  • Marine Technology News

  • Recfishwest

  • Woodside Energy

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।