আর্নহেম মেরিন পার্কে সামুদ্রিক প্রাণী পর্যবেক্ষণে Lookout+ AI সিস্টেমের দুই মাসের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

Greenroom Robotics-এর সারাংশ

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল সামুদ্রিক অঞ্চল আর্নহেম মেরিন পার্কে (Arnhem Marine Park) 'লুকআউট+' (Lookout+) নামক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার দুই মাসব্যাপী সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ফ্রিম্যান্টল ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্রিনরুম রোবোটিক্স (Greenroom Robotics) এবং রিভারসাইড ওশেনিক (Riverside Oceanic)-এর যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্পটি পরিচালিত হয়। এই অত্যাধুনিক সিস্টেমটি রিভারসাইড গার্ডিয়ান (Riverside Guardian) নামক একটি গবেষণা জাহাজে স্থাপন করে সমুদ্রের তলদেশ ও উপরিভাগের পরিস্থিতির ওপর নজরদারি চালানো হয়েছে।

লুকআউট+ হলো একটি উন্নত সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম যা অপটিক্যাল ক্যামেরা, রাডার এবং থার্মাল সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে একটি সমন্বিত পরিস্থিতির সচেতনতায় রূপান্তর করে। এর মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলো ৩৬০-ডিগ্রি ভিউর মাধ্যমে দিনরাত বিরতিহীনভাবে বিভিন্ন বস্তু শনাক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তি মানুষের চোখের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশেও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করে।

এই দুই মাসের মোতায়েনকালে সিস্টেমটি যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে তা নিচের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয়:

  • এটি মোট ১,৮৪০টি পৃথক বস্তু সফলভাবে ট্র্যাক করেছে।
  • সিস্টেমটি ২,৭৮৪ বর্গ নটিক্যাল মাইল সামুদ্রিক এলাকা জুড়ে নজরদারি চালিয়েছে।
  • কোনো প্রকার 'ব্লাইন্ড স্পট' বা অন্ধ অঞ্চল ছাড়াই এটি নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করেছে।

সাধারণত একজন মানুষের পক্ষে সমুদ্রের মাত্র ৩০ ডিগ্রি কোণে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব এবং সময়ের সাথে সাথে মানুষের ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। কিন্তু এই সেন্সর-ভিত্তিক ব্যবস্থাটি পরিবেশের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করে এবং জাহাজ, ভাসমান কাঠামো এমনকি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ভুলের ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে। এটি মূলত মানুষের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রয়াস।

গ্রিনরুম রোবোটিক্স মূলত স্বায়ত্তশাসিত জাহাজের সফটওয়্যার তৈরিতে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে তারা 'সেন্টিনেল' (Sentinel) নামক একটি স্বায়ত্তশাসিত টহল বোটের সফল সামুদ্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। বর্তমান প্রকল্পটি প্রমাণ করেছে যে, পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে এখন পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারিক প্রয়োগের সময় এসেছে।

টাউনসভিল ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রিভারসাইড ওশেনিক গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মেরিন সায়েন্স (AIMS) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাকে সামুদ্রিক সেবা প্রদান করে আসছে। এই এআই-ভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেমের সংযোজন তাদের অপারেশনাল ক্ষমতাকে এমনভাবে প্রসারিত করেছে যেখানে অতিরিক্ত জনবল বা বিশাল পরিচালনা ব্যয়ের প্রয়োজন নেই।

উত্তর অস্ট্রেলিয়ার আরাফুরা সাগরের সন্নিকটে অবস্থিত আর্নহেম মেরিন পার্ক তার অনন্য জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বখ্যাত। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে নৌ-চলাচলের ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা এবং সামুদ্রিক প্রাণীদের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। লুকআউট+ সিস্টেমটি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

এই বুদ্ধিমান সেন্সর সিস্টেমের একীভূতকরণ সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা বয়ে এনেছে:

  • এটি নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।
  • সমুদ্রে বিভিন্ন বস্তুর সাথে সংঘর্ষের সম্ভাবনা হ্রাস করে।
  • সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
  • সামুদ্রিক সম্পদের সঠিক ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সিস্টেম সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনার একটি নতুন মডেল তৈরি করছে যা রিয়েল-টাইম ডেটা বা তাৎক্ষণিক তথ্যের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। বিশেষ করে যেখানে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে, সেখানে এই প্রযুক্তি একটি টেকসই সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আর্নহেম মেরিন পার্কে লুকআউট+-এর এই পরীক্ষা সামুদ্রিক নজরদারিতে ডিজিটাল রূপান্তরের একটি জোরালো প্রতিফলন। এই প্রযুক্তিটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, স্বায়ত্তশাসিত বুদ্ধিমান সিস্টেমগুলো কেবল মানুষের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে না, বরং জটিল সামুদ্রিক পরিবেশে আমাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায় যা আগে কল্পনা করা অসম্ভব ছিল।

বিশ্বজুড়ে মহাসাগর সংরক্ষণের প্রতি যে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সমাধানগুলো এখন আর কেবল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এগুলো এখন একটি টেকসই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।

পরিশেষে বলা যায়, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সমুদ্র কেবল একটি বিশাল প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল স্থান হিসেবে আমাদের সামনে ধরা দিচ্ছে। আমরা এখন সমুদ্রকে আরও নিখুঁতভাবে শুনতে এবং আরও সচেতনভাবে রক্ষা করতে শিখছি, যা আমাদের আগামীর পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বার্তা।

4 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Ocean News & Technology

  • PRWire

  • TipRanks

  • ArcGIS StoryMaps

  • Greenroom Robotics

  • Riverside Marine

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।