ইউরোপের একটি প্রভাবশালী বহুবর্ষজীবী তৃণজাতীয় উদ্ভিদ বনজ স্ট্রবেরি (*Fragaria vesca* L.)-এর ওপর পরিচালিত একটি বিশাল জিনোম গবেষণা সম্প্রতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ২০০টি উচ্চমানের জিনোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই উদ্ভিদের অতীত জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছেন। এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো স্ট্রবেরি জনসংখ্যার জেনেটিক বিভাজন, যা মূলত পশ্চিম এবং পূর্ব—এই দুটি প্রধান ক্লাস্টারে বিভক্ত। উদ্ভিদের অভিযোজন প্রক্রিয়া এবং বিবর্তনীয় ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এই বিভাজনটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণার একটি কেন্দ্রীয় ফলাফল হলো তুষারযুগের চরম প্রতিকূলতার সময় পূর্ব অঞ্চলের স্ট্রবেরি গোষ্ঠীগুলোর উচ্চতর সহনশীলতা। পশ্চিমের গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় এই পূর্বীয় দলগুলো তাদের জনসংখ্যার কার্যকর আকার অনেক বেশি সফলভাবে বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে ইনব্রিডিং বা অন্তঃপ্রজননের কোনো ক্ষতিকর লক্ষণ দেখা যায়নি। এই তথ্যগুলো জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, হাজার হাজার বছর ধরে এই প্রজাতির জেনেটিক বৈচিত্র্য রক্ষায় পূর্ব দিকের আশ্রয়স্থলগুলো (refugia) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা পালন করেছে। জেনেটিক বিভাজন এবং সংরক্ষণের এই ধরনের প্যাটার্ন এর আগে অভ্যন্তরীণ ইউরেশিয়ার জিনোম ল্যান্ডস্কেপ সংক্রান্ত অন্যান্য গবেষণাতেও লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
বর্তমানে সমগ্র ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত স্ট্রবেরির বিশাল জনসংখ্যা মূলত মধ্য ইউরোপের মাধ্যমে পূর্ব-পশ্চিম অক্ষ বরাবর নিরবচ্ছিন্ন জেনেটিক বিনিময়ের ফলে টিকে আছে। এই গতিশীলতাকে বিজ্ঞানীরা 'কোর-পেরিফেরি' মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা এই প্রজাতির বিবর্তনীয় গতিপথ নির্ধারণে এবং পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জেনেটিক নমনীয়তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অন্যান্য *Fragaria* প্রজাতির ওপর পরিচালিত গবেষণা, বিশেষ করে শীতকালীন সহনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, অভিযোজিত বৈশিষ্ট্যের জন্য ভৌগোলিক উৎপত্তির গুরুত্বকে পুনরায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিশ্চিত করে।
সমান্তরাল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বন্য *F. vesca*-এর উচ্চ তুষার সহনশীলতার জন্য দায়ী জেনেটিক উপাদানগুলো বা ডিটারমিন্যান্টগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই জেনেটিক ফ্যাক্টরগুলো আধুনিক প্রজনন কর্মসূচির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো চাষযোগ্য স্ট্রবেরির এমন উন্নত জাত তৈরি করা যা বসন্তের শেষের মারাত্মক তুষারপাত সহ্য করতে সক্ষম। ফল ও বেরি জাতীয় ফসলের প্রজননে প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জিনগুলোর অধ্যয়ন বর্তমানে কৃষি বিজ্ঞানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। কারণ ক্যান্ডিডেট জিন বা সম্ভাব্য জিন খুঁজে বের করার মাধ্যমে প্রথাগত প্রজনন পদ্ধতির তুলনায় অনেক দ্রুত এবং নির্ভুল ফলাফল পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, *F. vesca*-এর এই জিনোম বিশ্লেষণ কেবল জলবায়ু অস্থিরতার মধ্যে এই প্রজাতির টিকে থাকার ইতিহাসকেই পুনর্গঠন করে না, বরং আধুনিক কৃষির স্থায়িত্ব বাড়াতে নির্দিষ্ট জেনেটিক উপাদানও সরবরাহ করে। পশ্চিম সাইবেরিয়ার জনসংখ্যায় ঋতুভিত্তিক ফুল ফোটার মতো প্রজনন বৈশিষ্ট্যের জেনেটিক নিয়ন্ত্রণ অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, এই প্রজাতির জেনেটিক কাঠামো অত্যন্ত জটিল এবং তা ক্রমবর্ধমান ঋতুর অবস্থার সাথে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। পূর্বীয় জনসংখ্যার জেনেটিক বিভাজন এবং সহনশীলতার প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রাপ্ত এই তথ্যগুলো প্রজননবিদদের জন্য একটি অমূল্য সম্পদ হিসেবে কাজ করবে, যা ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে বেরি জাতীয় ফসলের জিন পুলকে শক্তিশালী করতে এবং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।




