২০২৬ সালের ৯ই মার্চ, সোমবার, আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের মূল্যের আকস্মিক ও বিশাল উল্লম্ফনের পরিপ্রেক্ষিতে টোকিও এবং সিউলের শেয়ারবাজারগুলিতে তীব্র পতন পরিলক্ষিত হয়। এই অর্থনৈতিক অস্থিরতা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফল, যা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের উপর প্রভাব ফেলেছে। জাপানের প্রধান স্টক সূচক, নিক্কেই ২২৫, ৭ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়ে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর, যা প্রায় ৫১,৪০৭.৬৬ পয়েন্টে নেমে গিয়েছিল। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৮ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছিল, যা বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩১ মিনিটে ২০ মিনিটের জন্য ট্রেডিং হল্ট বা সার্কিট ব্রেকার সক্রিয় করতে বাধ্য করে। এই তীব্র মন্দার প্রেক্ষাপটে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের মান উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, যা প্রায় ১৫৮.৬৯ ইয়েনে লেনদেন হয়, যা ২০০৯ সালের পর সর্বনিম্ন পতন নির্দেশ করে।
এই সংকট সৃষ্টির মূল কারণ ছিল গত শনিবার, ৭ই মার্চ, ২০২৬ তারিখে ইরানের তেল স্থাপনাগুলিতে ইসরায়েলি বিমান হামলা, যার ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়, এবং এর অচলাবস্থা সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে, ইরানের অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস মোজতবা খামেনিকে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে, যা এই সংঘাতের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বে মোজতবা খামেনিকে নেতা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
তেলের দামের এই অভূতপূর্ব বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১১৪ থেকে ১১৯ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে, যা পূর্ববর্তী বন্ধের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। ব্রেন্ট ক্রুডও ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলার অতিক্রম করে, যা প্রায় ২৬.৯৮ শতাংশ বৃদ্ধি। কিছু বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে এবং WTI ক্রুডের দাম ১১৩.৪০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করতে পারে, যার ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইরাক সতর্ক করেছে যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ লোডিং পয়েন্টে প্রবেশ করতে না পারলে প্রতিদিন ৩০ লক্ষ ব্যারেলের বেশি তেলের ঘাটতি হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারের প্রধান কোম্পানি, যেমন স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্স, তাদের শেয়ার মূল্যে ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে হ্রাস দেখেছে। এই পরিস্থিতিতে, দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ত্রিশ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো জ্বালানি তেলের দামের ওপর একটি উর্ধ্বসীমা বা প্রাইস ক্যাপ নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে, জাপান, যাদের তেলের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় তেলের কৌশলগত মজুত ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী, কারণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বে পূর্বাভাস দিয়েছিল যে তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধির বিপরীতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমবে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি), যা ইসলামি ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বার্তা দেয়। হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা কেবল তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহেও চাপ সৃষ্টি করেছে, কারণ কাতারের এলএনজি রপ্তানির একটি বড় অংশ এই পথেই যায়। এই অস্থিরতা এশিয়ার বাজারগুলিতে মূলধন বহির্গমনকে ত্বরান্বিত করেছে এবং আগামী দিনগুলিতে বাজারগুলি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উপর নিবিড়ভাবে নজর রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হুমকি দিয়েছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই সংকট বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সামুদ্রিক বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি করতে পারে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।



