ইইউ এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব স্বাক্ষরিত
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
২০২৬ সালের ২৪ মার্চ ক্যানবেরায় এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং অস্ট্রেলিয়া তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) পাঠ্য চূড়ান্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এই চুক্তিটি মূলত ২০১৮ সালে শুরু হওয়া একটি অত্যন্ত জটিল এবং আট বছরব্যাপী আলোচনার সফল সমাপ্তি নির্দেশ করে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলটি চূড়ান্ত করার সময় উপস্থিত ছিলেন, যা দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
এই চুক্তির ফলে উভয় পক্ষই ব্যাপক অর্থনৈতিক সুফল পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে, অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি করা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৯৯ শতাংশেরও বেশি পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হবে। ব্রাসেলসের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে ইউরোপীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর শুল্ক বাবদ প্রায় ১০০ কোটি ইউরোরও বেশি অর্থ সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে। আগামী এক দশকে দুই অঞ্চলের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবার সামগ্রিক বাণিজ্য প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় ইইউ-এর রপ্তানি এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পাবে, যার মধ্যে দুগ্ধজাত পণ্যের রপ্তানি ৫০ শতাংশ এবং মোটরগাড়ির রপ্তানি ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এছাড়াও, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো এখন থেকে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি কেনাকাটা বা প্রকিউরমেন্ট বাজারে আরও সহজ ও বিস্তৃত প্রবেশাধিকার পাবে।
অস্ট্রেলীয় রপ্তানিকারকদের জন্য এই চুক্তিটি ইউরোপের বিশাল বাজারে প্রবেশের এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে ওয়াইন, বিভিন্ন ধরণের বাদাম, ফলমূল, শাকসবজি, মধু, অলিভ অয়েল, গম, বার্লি এবং সামুদ্রিক খাবারের মতো পণ্যের ওপর থেকে ইইউ শুল্ক তুলে নেবে। ধারণা করা হচ্ছে, শুধুমাত্র ওয়াইন রপ্তানিকারকরাই এর মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ৭০ লক্ষ অস্ট্রেলীয় ডলার অতিরিক্ত আয় করতে পারবেন। তবে কৃষি খাতের কিছু সংবেদনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই কিছুটা আপস করতে হয়েছে। গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস, চিনি, চাল এবং মাখনের মতো পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট কোটা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। যেমন, গরুর মাংসের জন্য বার্ষিক ৩০,৬০০ টন এবং ভেড়ার মাংসের জন্য ২৫,০০০ টনের কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য ও পর্যটন মন্ত্রী ডন ফারেল এই চুক্তিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন যে, এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ এবং তাদের ৪৫ কোটি ভোক্তার বিশাল বাজারে অস্ট্রেলীয় পণ্যের বৈচিত্র্য আনার পথ প্রশস্ত করবে।
বাণিজ্যিক এই মহাপরিকল্পনার পাশাপাশি, ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ উভয় পক্ষ ভার্চুয়ালি একটি 'নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব' (এসডিপি) স্বাক্ষর করেছে। এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় ইইউ-এর প্রধান কূটনীতিক কাজা ক্যালাস, অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রিচার্ড ডোনাল্ড মার্লস এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়ং অংশগ্রহণ করেন। বর্তমান বিশ্বের অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কৌশলগত খনিজ সম্পদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে এই অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে লিথিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজের মতো খনিজগুলোর ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদক, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সম্পদগুলোর একটি বড় ভোক্তা। এই চুক্তিটি মূলত সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সহযোগিতার অংশ হিসেবে, ২০২৭ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বের বৃহত্তম গবেষণা ও উদ্ভাবন কর্মসূচি 'হরাইজন ইউরোপ'-এ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক নেতারা এই চুক্তিকে একটি বিশাল জয় হিসেবে দেখছেন, অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরে কিছু মহলে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশটির মাংস রপ্তানিকারক সমিতিগুলো মনে করছে যে, গরুর মাংস ও ভেড়ার মাংসের জন্য নির্ধারিত কোটাগুলো তাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম এবং এটি তাদের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক লাভের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তা সত্ত্বেও, সামগ্রিকভাবে এই চুক্তিটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাব বৃদ্ধি এবং অস্ট্রেলিয়ার বাজার সম্প্রসারণে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
3 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Hercegovina.info
Anadolu Ajansı
Department of Foreign Affairs and Trade (Australia)
Euractiv
The Guardian
European Commission
এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



