ক্যারিবিয়ান সাগরে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং ভেনেজুয়েলার উপর চাপ: 'কার্টেল দে লস সোলেস'-কে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ঘোষণা

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

২৫শে নভেম্বর ২০২৫ তারিখের মধ্যে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বলিভারিয়ান প্রজাতন্ত্র ভেনেজুয়েলার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত। এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং একই সাথে ২৪শে নভেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া একটি আইনি পদক্ষেপ—যার মাধ্যমে 'কার্টেল দে লস সোলেস' (Cartel de los Soles)-কে বিদেশী সন্ত্রাসী সংস্থা (FTO) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

সামরিক তৎপরতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো ভেনেজুয়েলার সংলগ্ন ক্যারিবীয় সাগরের জলসীমা। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৯ সালে পানামায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের পর থেকে এই অঞ্চলে এত বড় আকারের সামরিক মোতায়েন আর দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতি আরও তীব্র করে তুলেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক নেওয়া সিদ্ধান্তটি, যা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে 'কার্টেল দে লস সোলেস'কে এফটিও (FTO) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওয়াশিংটনের দাবি, নিকোলাস মাদুরো এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সংগঠনটি দেশের সামরিক, গোয়েন্দা, আইন প্রণয়নকারী এবং বিচার বিভাগকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও দাবি করেছে যে, 'কার্টেল দে লস সোলেস' মেক্সিকোর 'কার্টেল সিনালোয়া' এবং ভেনেজুয়েলার 'ট্রেন দে আরাগুয়া'-এর মতো সংগঠনের সাথে হাত মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মাদক পাচার করছে। ভেনেজুয়েলা অবশ্য এই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে এবং এটিকে 'হাস্যকর মিথ্যাচার' বলে অভিহিত করেছে। কারাকাস মনে করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তির প্রতি সরাসরি হুমকি স্বরূপ।

অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার (Operation Southern Spear) কোড নামে পরিচালিত এই সামরিক অভিযান ইতিমধ্যেই ফল দিতে শুরু করেছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে শুরু করে, মার্কিন বাহিনী সন্দেহভাজন মাদক বহনকারী জাহাজে কমপক্ষে ২১টি নৌ-আক্রমণ চালিয়েছে, যার ফলে আনুমানিক ৮৩ জন নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কারাকাস এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায়, যার মধ্যে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের নেতৃত্বে একটি বিমানবাহী রণতরী গোষ্ঠী মোতায়েন করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ২৫,০০০ সৈন্যকে একত্রিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ সামরিক সমাবেশ।

এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলো বেশ কঠিন অবস্থানে পড়েছে। ত্রিনিদাদ ও টোবাগো-এর প্রধানমন্ত্রী কমলা পেরসাড-বিসেসার মার্কিন জাহাজগুলোর আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন, যা কারাকাসের সাথে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এর ফলস্বরূপ, ভেনেজুয়েলা দ্বীপ রাষ্ট্রটির সাথে তাদের সমস্ত জ্বালানি চুক্তি স্থগিত করেছে। অন্যদিকে, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো-এর সামরিক বাহিনীকে উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। মার্কিন সামরিক অভিযানের আশঙ্কায় দেশটির মৎস্য শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে মাছ ধরার পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে বলে জানা গেছে।

এই সংঘাতের মূল প্রেক্ষাপট নিহিত রয়েছে ২৮শে জুলাই ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটে। ওই নির্বাচনে মাদুরো জয়ী হলেও, বিরোধী দল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পক্ষ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উররুতিয়াকে সমর্থন জানিয়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লাতিন আমেরিকার ওপর মনোযোগ আরও বাড়িয়েছেন। সামরিক, আইনি এবং কূটনৈতিক স্তরে এই বহুমাত্রিক উত্তেজনা ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল এখন শুধু প্রতিরোধ নয়, বরং এই অঞ্চলে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে মোড় নিয়েছে।

উৎসসমূহ

  • El HuffPost

  • Diario La República

  • Trinidad Guardian

  • AS/COA Online

  • Flightradar24 Blog

  • Yeni Safak English

  • The Economic Times

  • Marco Rubio - United States Department of State

  • Venezuela: Political Crisis and U.S. Policy - Congress.gov

  • The US 'war on terror' has killed millions. Now Trump is bringing it to Venezuela | Daniel Mendiola | The Guardian

  • Marco Rubio - United States Department of State

  • The Guardian

  • Caribbean Life

  • The Caribbean Camera

  • International Center for Transitional Justice

  • The Guardian

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?

আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।