ইরানে গণবিক্ষোভের ঢেউ রাজধানী তেহরানেও আছড়ে পড়েছে
সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush
২০২৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভের ঢেউ অব্যাহত রয়েছে সমগ্র ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান জুড়ে। এই দেশব্যাপী প্রতিবাদ, যা রাজধানী তেহরান, মাশহাদ এবং অন্যান্য প্রধান শহরগুলিকে গ্রাস করেছে, প্রাথমিকভাবে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শুরু হলেও দ্রুতই তা শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের সরাসরি রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিয়েছে।
এই অস্থিরতার সূত্রপাত ঘটেছিল তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার বা ঐতিহাসিক বাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মাধ্যমে। এর মূল কারণ ছিল জাতীয় মুদ্রার নাটকীয় পতন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ইরানি রিয়ালের মূল্যমান মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১.৪ মিলিয়নের নিচে নেমে গেছে, যা এক ঐতিহাসিক নিম্নস্তর। এই আর্থিক বিপর্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতি; ডিসেম্বর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, মুদ্রাস্ফীতির হার পৌঁছেছিল ৪২.২ শতাংশে, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে ৭০ থেকে ১১০ শতাংশ বা তারও বেশি। সামাজিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে সরকার জনগণের জন্য মাসিক প্রায় ৭ ডলারের ভাতা ঘোষণা করলেও, বিক্ষোভকারীরা এটিকে যথেষ্ট মনে করেনি।
অর্থনৈতিক ধাক্কার আবহে বিক্ষোভকারীরা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে অপসারণের দাবিতে স্লোগান তুলেছে। তারা নির্বাসিত শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভিকেও সমর্থন জানিয়েছে, যিনি পূর্বে এই জানুয়ারির বিক্ষোভের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ কাশানি বুলেভার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নারী, পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে সকলে সম্মিলিতভাবে রাস্তায় নেমে আসে, যা প্রতিবাদের ঐক্যবদ্ধ চিত্র তুলে ধরে। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকলে রাস্তা অবরোধ করা হয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়।
কর্তৃপক্ষ দমন-পীড়ন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বেশ কয়েকটি শহরে সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একইসঙ্গে, তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেন মোহসেনি-এজেয়ি এই অস্থিরতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো বহিরাগত শত্রুদের দায়ী করেছেন এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতি কোনো প্রকার ছাড় না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেস্কিয়ান আইন প্রয়োগকারী বাহিনীকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ বজায় রেখে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন।
এই অর্থনৈতিক দুর্দশা সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষত, জুন ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের পরিণতি এবং পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হামলার প্রভাব পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের ফলে অভ্যন্তরীণ কাঠামো আরও দুর্বল হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে ইরানের শাসকরা যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে, তবে তার ফল হবে ‘অত্যন্ত কঠোর’।
মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR)-এর তথ্য অনুসারে, সংঘর্ষের ফলে কমপক্ষে ৪৫ জন নিহত হয়েছেন, যদিও সরকারি সূত্রগুলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ মোট ২১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। দুই হাজারের বেশি মানুষ আটক হওয়ার খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্টতই নির্দেশ করে যে ভূ-রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট গভীর অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো এক সঙ্কটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বর্তমান শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
38 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Courrier international
PBS
The Hindu
Wikipedia
CBS News
TV5MONDE Info
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
