দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি: "আমরা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকি, তবে আমরা মেনুতে থাকব"

লেখক: gaya ❤️ one

কানাডার প্রধানমন্ত্রী Марк Карни ডাভোসে

২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এক বিশেষ ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ফোরামের দ্বিতীয় দিনে প্রদত্ত তার প্রায় ১৫ মিনিটের এই বক্তব্যটি উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে এক বিরল উদ্দীপনার সৃষ্টি করে, যার সমাপ্তি ঘটে এক স্বতঃস্ফূর্ত করতালির (standing ovation) মাধ্যমে। যদিও কিছু সূত্র ২০ বা ২১ জানুয়ারির কথা উল্লেখ করেছে, তবে ২২ জানুয়ারি মঙ্গলবারই ছিল এই প্রভাবশালী বক্তৃতার মূল দিন।

কার্নি তার বক্তব্যে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির এক গভীর সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, বিশ্ব এখন কোনো সাধারণ রূপান্তর বা সংশোধনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, বরং এটি একটি বিশাল 'ফাটল' বা 'বিচ্ছেদ' (rupture)-এর সম্মুখীন। তিনি সতর্ক করে দেন যে, নিয়ম-নীতি, পারস্পরিক সুবিধা এবং সমন্বয়ের ওপর ভিত্তি করে যে পুরনো বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা আর কখনোই ফিরে আসবে না।

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অতীতের প্রতি মোহগ্রস্ত থাকাকে তিনি একটি অকার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, "পুরনো ব্যবস্থা আর ফিরবে না এবং নস্টালজিয়া বা অতীতবিলাস কোনো কৌশল হতে পারে না।" এই পরিবর্তনের যুগে টিকে থাকতে হলে বাস্তবমুখী এবং ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন।

বিশ্বের পরাশক্তিগুলো বর্তমানে অর্থনীতিকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে কার্নি উল্লেখ করেন। শুল্ক আরোপকে চাপের মাধ্যম হিসেবে, আর্থিক অবকাঠামোকে বাধ্য করার সরঞ্জাম হিসেবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে শোষণের দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের ৩০ শতাংশেরও বেশি এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার, যা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

এই নতুন এবং কঠিন বাস্তবতায় কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মতো মাঝারি শক্তির দেশগুলোর (middle powers) সবচেয়ে বেশি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, আবার সবচেয়ে বেশি অর্জনের সুযোগও রয়েছে। কার্নি মনে করেন, এই দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবে তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে সক্ষম হবে এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলা করতে পারবে।

মাঝারি শক্তির দেশগুলোর প্রতি এক জোরালো আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "মাঝারি শক্তিগুলোকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কারণ আমরা যদি আলোচনার টেবিলে নিজেদের জায়গা করে নিতে না পারি, তবে আমাদের অন্যের 'মেনু' বা শিকারে পরিণত হতে হবে।" তিনি পরাশক্তিগুলোর অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হওয়ার পরামর্শ দেন, কারণ এটি দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনার সমান।

দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে দুর্বল অবস্থানে থেকে দরকষাকষি করার পরিবর্তে, কার্নি জোট গঠন এবং নিজস্ব সক্ষমতা (resilience) বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। তিনি মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার মতো মূল্যবোধগুলোকে সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান। তার মতে, সম্মিলিতভাবে কাজ করলেই নিয়ম-নীতির বৈধতা এবং অখণ্ডতা বজায় রাখা সম্ভব।

পরিশেষে, মার্ক কার্নি সতর্ক করে দেন যে, বিচ্ছিন্নতা বা 'দুর্গের বিশ্ব' কেবল দারিদ্র্য এবং ভঙ্গুরতাই বয়ে আনবে। বিশ্বকে আরও স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ করতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। তার এই দূরদর্শী বক্তব্য বিশ্ব অর্থনীতি এবং রাজনীতির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে মাঝারি শক্তির দেশগুলোর ঐক্যই হবে আগামী দিনের মূল চাবিকাঠি।

63 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।