ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে ১০৪ জন রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি অন্তত ১০৪ জন রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা 'ফোরো পেনাল' (Foro Penal) এই তথ্যটি যাচাই করে নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির পরিচালক আলফ্রেডো রোমেরো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক বার্তায় প্রাথমিকভাবে ৮০ জনের মুক্তির কথা জানালেও পরবর্তীতে এই সংখ্যা বেড়ে ১০৪-এ দাঁড়ায় বলে নিশ্চিত করেন। তবে সংস্থাটির বিশিষ্ট আইনজীবী গনজালো হিমিয়ব সতর্ক করে বলেছেন যে, এই সংখ্যাটি এখনও চূড়ান্ত নয় এবং মাঠ পর্যায়ে আরও তথ্য সংগ্রহের পর এটি পরিবর্তিত বা সংশোধিত হতে পারে।

এই বন্দি মুক্তির ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ভেনেজুয়েলা চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এর ঠিক দুই দিন পর, ৫ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করায়। রদ্রিগেজ প্রশাসন দাবি করেছে যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬২৬ জন রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে 'ফোরো পেনাল' এই সরকারি পরিসংখ্যানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে এবং বলেছে যে তারা এখন পর্যন্ত সরকারি দাবির মাত্র অর্ধেক বন্দির মুক্তির সত্যতা নিশ্চিত করতে পেরেছে।

গত ৮ জানুয়ারি থেকে বন্দি মুক্তির এই প্রক্রিয়াটি উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত হয়েছে, যা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক চাপের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির শুরু থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অন্যতম প্রার্থী এনরিকে মার্কেজ এবং পাঁচজন স্প্যানিশ নাগরিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তবে ফ্রেডি সুপারলানো এবং হুয়ান পাবলো গুয়ানিপার মতো শীর্ষস্থানীয় বিরোধী নেতাদের মুক্তি না দেওয়ায় উদ্বেগ রয়েই গেছে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে টোকোরন কারাগারে বন্দি থাকা 'ফোরো পেনাল'-এর স্বেচ্ছাসেবক আইনজীবী কেনেডি তেজেদার মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি বর্তমান পরিস্থিতির একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন তেল চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন এবং দেশে বিভিন্ন আইনি সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। পুয়ের্তো লা ক্রুজ-এ তেল খাতের শ্রমিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে রদ্রিগেজ স্পষ্ট করে বলেন যে, তার সরকার কোনো বিদেশি শক্তির নির্দেশে চলবে না এবং ওয়াশিংটনের আদেশের চেয়ে অভ্যন্তরীণ সংলাপকে বেশি গুরুত্ব দেবে। তিনি 'বলিভারিয়ান কূটনীতি'র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিদ্যমান সকল মতপার্থক্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি দেন। গত ১৫ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে রদ্রিগেজের একটি দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়, যা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়। এদিকে ভেনেজুয়েলায় নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত সের্গেই মেলিক-বাগদাসারভ মন্তব্য করেছেন যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং ভবিষ্যতে নিকোলাস মাদুরোর দেশে ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার সংগঠনগুলো বন্দি মুক্তির এই প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। তারা মুক্তিপ্রাপ্তদের একটি আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছে, কারণ বর্তমানে তথ্য যাচাইয়ের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। উদাহরণস্বরূপ, 'জাস্টিসিয়া, এনকুয়েন্ট্রো ই পারডন' (JEP) নামক সংস্থাটি জানিয়েছে যে, রদ্রিগেজ সরকারের ৬২৬ জনের দাবির বিপরীতে তারা মাত্র ১৭৪টি ঘটনার সত্যতা পেয়েছে। 'ফোরো পেনাল'-এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে এখনও ৭৭৭ জন রাজনৈতিক বন্দি কারান্তরীণ রয়েছেন। সামগ্রিকভাবে, নতুন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক চাপ কমানো এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি কৌশলগত চাল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও বন্দিদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।

4 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Anadolu Ajansı

  • blue News

  • TV5MONDE Info

  • Radio Lac

  • The Guardian

  • FRANCE 24

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।