কানাডার প্রথিতযশা খনি শিল্প প্রতিষ্ঠান টেক রিসোর্সেস (Teck Resources) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় ধাতু প্রক্রিয়াকরণকারী কোম্পানি কোরিয়া জিঙ্ক কোং (Korea Zinc Co.) ২০২৬ সালের জন্য দস্তা বা জিঙ্ক কনসেন্ট্রেট পরিশোধনের শর্তাবলী চূড়ান্ত করার বিষয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এই নতুন চুক্তিটি বিশ্বব্যাপী কাঁচামাল এবং খনিজ সম্পদের বাজারে যে আমূল পরিবর্তন আসছে তার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে খনিজ আকরিক থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উপজাত বা বাই-প্রোডাক্টগুলোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই সমঝোতাটি তৈরি করা হয়েছে।
এই চুক্তির একটি প্রধান দিক হলো টেক রিসোর্সেস তাদের উত্তোলিত আকরিকের মধ্যে থাকা রূপা (silver) এবং জার্মেনিয়াম (germanium)-এর মতো মূল্যবান ধাতুগুলো থেকে আয়ের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য বিশেষ কৌশল গ্রহণ করেছে। কোম্পানিটি এই সহ-ধাতুগুলোর প্রক্রিয়াকরণ ফি বা চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে, যা টেক-কে তাদের সম্পদের সঠিক আর্থিক মূল্য নিশ্চিত করতে এবং এই মূল্যবান ধাতুগুলো থেকে আরও বেশি মুনাফা অর্জন করতে সহায়তা করবে। এটি খনি শিল্পের বর্তমান প্রবণতাকে তুলে ধরে যেখানে প্রতিটি উপাদানের বাণিজ্যিক গুরুত্বকে সমানভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের জন্য দস্তা গলানোর বা স্মেল্টিং-এর ক্ষেত্রে বেস ট্রিটমেন্ট চার্জ (TC) প্রতি টনে ৮৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিমাণটি ২০২৫ সালের ৮০ মার্কিন ডলারের বেঞ্চমার্কের তুলনায় বেশি, যা গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দস্তা শিল্পে সর্বনিম্ন রেকর্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। তবে এবারের চুক্তিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো এসেছে উপজাত পণ্যগুলোর প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত শর্তাবলীতে, যা মূলত টেক রিসোর্সেসের অনুকূলে ভারসাম্য রক্ষা করেছে। বিশেষ করে, রূপার ক্ষেত্রে অর্থ প্রদানের সীমা বা থ্রেশহোল্ড কমিয়ে আনা হয়েছে, যার ফলে এই ধাতু থেকে টেক-এর আয়ের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি, খনি শিল্পের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টেক তাদের কনসেন্ট্রেটে থাকা জার্মেনিয়াম প্রক্রিয়াকরণের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি চালু করতে যাচ্ছে।
এই দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার পেছনে সবচেয়ে প্রভাবশালী কারণ ছিল বিশ্ববাজারে উপজাত পণ্যগুলোর মূল্যের অভাবনীয় এবং দ্রুত বৃদ্ধি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রূপার বাজার মূল্য প্রায় ১৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জার্মেনিয়ামের দাম বেড়েছে ৭৫%। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে রূপার দাম প্রতি আউন্স ১০০ মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক সীমা অতিক্রম করে। কোরিয়া জিঙ্ক, যারা বর্তমানে বিশ্বের মোট রূপা সরবরাহের প্রায় ৫% নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, ২০২৫ সালে তাদের সর্বকালের রেকর্ড মুনাফা অর্জন করেছে। যদিও সেই সময় দস্তা প্রক্রিয়াকরণের বেস চার্জ ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন ছিল, তবুও রূপা ও অন্যান্য উপজাতের আকাশচুম্বী মূল্য কোম্পানিটিকে এই বিশাল আর্থিক সাফল্য এনে দিয়েছে, যা এই ধাতুগুলোর ক্রমবর্ধমান আর্থিক গুরুত্বকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।
সামগ্রিকভাবে, টেক রিসোর্সেস এবং কোরিয়া জিঙ্কের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তিটি খনিজ সম্পদ খাতের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান বাজারে কেবল মূল ধাতুর ওপর নির্ভর না করে আকরিকের প্রতিটি মূল্যবান উপাদানের জন্য ন্যায্য হিস্যা এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণ করা কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই কৌশলগত পরিবর্তনটি ভবিষ্যতে অন্যান্য খনিজ উত্তোলনকারী এবং প্রক্রিয়াকরণকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।




