আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য নির্ধারিত ওরিয়ন মহাকাশযানের অভ্যন্তরীণ বাসযোগ্য আয়তন ৯.৩৪ কিউবিক মিটার, যা প্রায় দুটি মিনিভ্যানের সম্মিলিত আয়তনের সমান। এই বিশেষ মিশনটি মূলত চাঁদের চারপাশে একটি ফ্লাইবাই বা প্রদক্ষিণমূলক যাত্রা হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছে, যেখানে কোনো চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ ছাড়াই একটি 'ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টোরি' বা মুক্ত-প্রত্যাবর্তন পথ অনুসরণ করা হবে। এই কক্ষপথটি অনেকটা ঐতিহাসিক অ্যাপোলো ৮ এবং অ্যাপোলো ১৩ মিশনের ব্যবহৃত পথের অনুরূপ।
এই রোমাঞ্চকর অভিযানে চারজন দক্ষ নভোচারীর একটি দল অংশগ্রহণ করছেন। মিশনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন রিড ওয়াইজম্যান (Reid Wiseman), পাইলট হিসেবে থাকছেন ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover), এবং মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে ক্রিস্টিনা কচ (Christina Koch) ও কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির (CSA) জেরেমি হ্যানসেন (Jeremy Hansen) যুক্ত হয়েছেন। এই চার সদস্যের দলটি প্রায় ১০ দিন মহাকাশে অবস্থান করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই মিশনের উৎক্ষেপণ ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের আগে সম্ভব নয়। উৎক্ষেপণের জন্য প্রথম সম্ভাব্য সময় বা উইন্ডোটি ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নির্ধারিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী প্রায় ২২:২৪ ইউটিসি (১৮:২৪ ইডিটি)। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির জন্য বিশ্বজুড়ে মহাকাশপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
এপ্রিল মাসে ১ তারিখ ছাড়াও আরও বেশ কিছু সম্ভাব্য উৎক্ষেপণ সূচি রয়েছে। নাসা-র পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩ থেকে ৬ এপ্রিল এবং ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বিকল্প উইন্ডোগুলো ব্যবহার করা হতে পারে। প্রতিটি উইন্ডো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গণনা করা হয়েছে যাতে মহাকাশযানটি সঠিক কক্ষপথে প্রবেশ করতে পারে এবং মিশনটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
কারিগরি দিক থেকে কিছু চ্যালেঞ্জের কারণে এই বিলম্ব ঘটেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে রকেটের উপরের স্তরে (ICPS) হিলিয়াম সরবরাহে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় রকেটটিকে পুনরায় ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ে (VAB) ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল। এর ফলে মার্চের উৎক্ষেপণ সুযোগগুলো হাতছাড়া হলেও নাসা আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছে যে, সমস্যাটি পুরোপুরি সমাধান করা হয়েছে এবং এপ্রিলের লক্ষ্যমাত্রা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।
এটি মানব ইতিহাসের জন্য একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে, কারণ অ্যাপোলো মিশনের পর এই প্রথম মানুষ পুনরায় গভীর মহাকাশে পাড়ি জমাচ্ছে। আর্টেমিস ২-এর সফল সমাপ্তির পর আর্টেমিস ৩ মিশন ২০২৭ সালে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যদিও এর লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা পরিবর্তন করে পৃথিবী সংলগ্ন মহাকাশ পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। চাঁদের মাটিতে মানুষের প্রথম অবতরণ এখন ২০২৮ সালের আর্টেমিস ৪ মিশনের জন্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
ওরিয়ন মহাকাশযানটি তার পূর্বসূরি অ্যাপোলোর তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক এবং প্রশস্ত। অ্যাপোলো কমান্ড মডিউলের বাসযোগ্য স্থান ছিল মাত্র ৫.৯৫ কিউবিক মিটার, যেখানে ওরিয়ন নভোচারীদের জন্য ৯.৩৪ কিউবিক মিটার জায়গা নিশ্চিত করছে। এই বাড়তি জায়গা দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ যাত্রায় নভোচারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭-এর পর এটিই হবে নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথের বাইরে প্রথম মানববাহী অভিযান। এই মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো গভীর মহাকাশের চরম পরিবেশে ওরিয়নের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থাগুলোর সক্ষমতা যাচাই করা। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নভোচারীরা মাইক্রোগ্রাভিটি বা ওজনহীন পরিবেশে চলাফেরার জায়গা বাড়াতে কমান্ডার ও পাইলটের ফুটরেস্টগুলো সরিয়ে ফেলার মতো খুঁটিনাটি বিষয়গুলোও অনুশীলন করছেন।
প্রকৌশলগতভাবে ওরিয়ন একটি অত্যন্ত জটিল যান, যেখানে লকহিড মার্টিনের তৈরি লিভিং মডিউলের সাথে এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেসের তৈরি ইউরোপীয় সার্ভিস মডিউল যুক্ত করা হয়েছে। কেনেডি স্পেস সেন্টারের এলসি-৩৯বি (LC-39B) লঞ্চ প্যাড থেকে শক্তিশালী স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (SLS) রকেটের মাধ্যমে এই মিশনটি শুরু হবে। ওরিয়ন ক্যাপসুলটির ব্যাস ৫ মিটার, যা অ্যাপোলোর ৩.৯ মিটারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড়।
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ওরিয়নে যুক্ত করা হয়েছে টয়লেট এবং ছোট ব্যায়ামাগারের মতো সুবিধা, যা আগের মহাকাশযানগুলোতে ছিল না। এর হিট শিল্ডে ব্যবহৃত এভকোট (AVCOAT) উপাদানটি অ্যাপোলোর মতোই কার্যকর কিন্তু বর্তমানে এটি অনেক সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। সাত লক্ষ গ্যালনেরও বেশি ক্রায়োজেনিক জ্বালানি ব্যবহার করে সফল মহড়া সম্পন্ন করার মাধ্যমে আর্টেমিস ২ এখন চূড়ান্ত যাত্রার জন্য প্রস্তুত, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহ অভিযানের পথ প্রশস্ত করবে।
