হংকংয়ের তাই পো-তে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: ৯৪ জনের প্রাণহানি, প্রায় আশি বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক বিপর্যয়

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

গত ২৬শে নভেম্বর, ২০২৫, বুধবার, হংকংয়ের তাই পো এলাকার ওয়াং ফুক কোর্ট আবাসিক কমপ্লেক্সে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় কমপক্ষে ৯৪ জন মানুষের জীবনাবসান হয়, যাদের মধ্যে একজন দমকলকর্মীও ছিলেন। এই দুর্ঘটনাটিকে শহরের গত প্রায় আশি বছরের মধ্যে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর আগে, ১৯৪৮ সালের উইং অন ওয়্যারহাউস অগ্নিকাণ্ডে যতজন মারা গিয়েছিলেন, এই ঘটনায় সেই সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৮৩ সালে নির্মিত এই কমপ্লেক্সের সাতটি বহুতল টাওয়ারে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিপদ সংকেত সর্বোচ্চ পঞ্চম স্তরে পৌঁছায়। উল্লেখ্য, টাওয়ারগুলি তখন বড় ধরনের সংস্কার কাজের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

কর্তৃপক্ষ দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে বহিরাংশে ব্যবহৃত বাঁশের মাচা এবং সবুজ নির্মাণ জালকে দায়ী করেছে। এই উপাদানগুলি অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় আগুনের দ্রুত প্রসারে সহায়ক হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, জানালা সিল করার জন্য পলিথিন ফোম শিটের মতো সহজে জ্বলে ওঠা উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ভয়াবহতার পরিপ্রেক্ষিতে, হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি ঘোষণা করেছেন যে, বড় ধরনের সংস্কার চলছে এমন সমস্ত আবাসিক কমপ্লেক্সে নির্মাণ সামগ্রী নিরাপত্তা বিধি মেনে চলছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক পরিদর্শন চালানো হবে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি পরিষেবা বিভাগ প্রায় ১২৮টি দমকল ইঞ্জিন এবং শত শত দমকলকর্মীকে নিযুক্ত করেছিল। ৩১তলা বিশিষ্ট ভবনগুলোর ছাদে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন ছিল, কারণ সেখানে তাপমাত্রা অসহনীয়ভাবে বেশি ছিল। সিডনির ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে অধ্যাপক এহসান নুরুজিনেজাদ মন্তব্য করেন যে, উঁচু ভবনের জন্য ইস্পাত বা অ্যালুমিনিয়ামের মাচা ব্যবহার করা অনেক বেশি নিরাপদ, কারণ এগুলি দাহ্য নয়। এর প্রতিক্রিয়ায়, হংকং কর্তৃপক্ষ আগেই শুরু হওয়া সরকারি প্রকল্পগুলিতে ধাতব কাঠামোতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত করার অঙ্গীকার করেছে, যা ২০২৫ সালে শুরু হয়েছিল।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পুলিশ নির্মাণ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত তিন ব্যক্তিকে অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে আটক করেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই বিপর্যয়ের পেছনে হয়তো কোনো ধরনের গুরুতর গাফিলতি বা অপরাধমূলক কার্যকলাপ জড়িত ছিল। জানা গেছে, কমপ্লেক্সের বাসিন্দারা নির্মাণ শ্রমিকদের মাচার কাছাকাছি ধূমপান করতে দেখার বিষয়ে গত ছয় মাস ধরে অভিযোগ জানাচ্ছিলেন। এমনকি, একজন প্রাক্তন নিরাপত্তা প্রধান নিশ্চিত করেছেন যে, শ্রমিকদের সুবিধার জন্য আগুন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুর্ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগেই শ্রম দপ্তর ঠিকাদারি সংস্থাকে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সতর্ক করেছিল।

কাউলুন ও হংকংয়ের বাঁশ মাচা শ্রমিক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হো পিন-টাক একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অগ্নি-প্রতিরোধী জাল এবং সাধারণ জালের দামের মধ্যে বিশাল পার্থক্য থাকায় ঠিকাদাররা প্রায়শই কম দামি, অনিরাপদ উপকরণ ব্যবহার করতে প্রলুব্ধ হন। কারণ, জালের জন্য অগ্নি-প্রতিরোধী হওয়ার বাধ্যবাধকতা এখনও আইন নয়, কেবল একটি সুপারিশ মাত্র। এই ভয়াবহতার পর, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তার জন্য কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ৩০০ মিলিয়ন হংকং ডলারের একটি ত্রাণ তহবিল গঠন করেছে।

উৎসসমূহ

  • Deutsche Welle

  • RNZ News

  • Wikipedia

  • CBS News

  • Reuters

  • The Guardian

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?

আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।