কপারনিকাস রিপোর্ট: ২০২৫ সাল ইতিহাসের তৃতীয় উষ্ণতম বছর, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

ইউরোপীয় জলবায়ু পরিবর্তন সংস্থা 'কপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস' (C3S) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একটি নতুন বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮৫০ সালে যান্ত্রিকভাবে তাপমাত্রা পরিমাপ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালটি ইতিহাসের তৃতীয় উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের গড় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের (১৮৫০-১৯০০) তুলনায় ১.৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এই তাপমাত্রা ২০২৩ সালের তুলনায় ০.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রেকর্ড সৃষ্টিকারী ২০২৪ সালের তুলনায় ০.১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম হলেও, এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারাবাহিকতাকে স্পষ্ট করে তোলে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৫ সালটি ছিল 'লা নিনা' (La Niña) পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ বছর, যা প্রমাণ করে যে জলবায়ুর প্রাকৃতিক পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের সৃষ্ট কারণগুলোই এখন বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।

C3S-এর এই বিশ্লেষণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ২০২৩ থেকে ২০২৫—এই তিন বছরের গড় তাপমাত্রা প্রথমবারের মতো ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করেছে। কপারনিকাস সার্ভিসের পরিচালক কার্লো বুওনটেম্পো এই পরিস্থিতিকে অনিবার্য বলে বর্ণনা করেছেন এবং এখন এই পরিবর্তনের প্রভাবগুলো মোকাবিলা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সংস্থার উপ-পরিচালক সামান্থা বার্গেস এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান উষ্ণায়নের গতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যেই ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের এই সীমা স্থায়ীভাবে ভেঙে যেতে পারে। এটি প্যারিস চুক্তির সময় করা প্রাথমিক পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় এক দশক আগে ঘটছে, যা জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

২০২৫ সালে আঞ্চলিক জলবায়ুর অস্বাভাবিকতাগুলো ছিল অত্যন্ত তীব্র। অ্যান্টার্কটিকায় ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর রেকর্ড করা হয়েছে এবং আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলে এটি ছিল দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই মেরু অঞ্চলের সামুদ্রিক বরফের মোট পরিমাণ ১৯৭০-এর দশকে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এছাড়া, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডে 'তীব্র' তাপীয় চাপের (৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা) দিন সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় ভয়াবহ দাবানল সৃষ্টি হয়েছে। 'ক্যামস' (CAMS)-এর পরিচালক লরেন্স রুইল নিশ্চিত করেছেন যে, মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্বের নিরবচ্ছিন্ন বৃদ্ধিই এই চরম তাপমাত্রার প্রধান কারণ।

এই উদ্বেগজনক জলবায়ু তথ্যগুলো এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন ব্রাজিলের বেলেমে ১০ থেকে ২১ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ৩০তম সম্মেলন (COP30) অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমাজন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল বাকুতে অনুষ্ঠিত COP29-এ সম্মত হওয়া আর্থিক সরঞ্জামগুলোকে আরও শক্তিশালী করা। যদিও প্রায় ১০০টি দেশ তাদের 'জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান' (NDC) আপডেট করেছে, তবে COP30-এর চূড়ান্ত দলিলে জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার কোনো বাধ্যতামূলক পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য যে, COP29-এ ২০৩৫ সালের মধ্যে জলবায়ু অর্থায়নকে বছরে কমপক্ষে ১.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার বিষয়ে একমত হওয়া হয়েছিল।

COP30 সম্মেলনে 'গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশন' বা অভিযোজন সংক্রান্ত বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার সূচকগুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে পানামা, সিয়েরা লিওন, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রাগুলোর পরিমাপযোগ্যতার অভাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের হালনাগাদকৃত NDC পেশ করেছে, যেখানে ১৯৯০ সালের স্তরের তুলনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৬৬.২৫% থেকে ৭২.৫% কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু নিরপেক্ষতা অর্জনের পথে ইউরোপের অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করে।

10 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Deutsche Welle

  • Copernicus Climate Change Service

  • The Guardian

  • Anadolu Ajansı

  • Earth.Org

  • IISD Earth Negotiations Bulletin

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।