কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে ইরানে হামলা স্থগিতের মেয়াদ বাড়াল যুক্তরাষ্ট্র
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে পরিকল্পিত সামরিক হামলা চালানোর ওপর স্থগিতাদেশ আরও দশ দিন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে হামলার সম্ভাব্য সময়সীমা ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আসা একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ এবং বর্তমানে চলমান ইতিবাচক কূটনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে এই আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে, তবুও ওয়াশিংটন একে উত্তেজনা প্রশমনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এই সামরিক স্থগিতাদেশ মূলত হরমুজ প্রণালী অবরোধ এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পূর্ববর্তী কয়েক দফা আলোচনার ব্যর্থতার পর সৃষ্ট চরম উত্তেজনা কমানোর একটি সাময়িক প্রচেষ্টা। তবে কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অতিরিক্ত ১০,০০০ পদাতিক ও সাঁজোয়া সৈন্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। এই নতুন বাহিনী বর্তমানে ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা ৫,০০০ মেরিন সেনা এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের হাজার হাজার প্যারাট্রুপারের শক্তিকে আরও বৃদ্ধি করবে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের লক্ষ্য হতে পারে ইরানের কৌশলগত তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো।
বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি এগিয়ে চলছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানকে ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আলোচনার টেবিলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। এই প্রস্তাবের মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের তিনটি প্রধান পরমাণু স্থাপনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখা এবং তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম পুরোপুরি বন্ধ করা। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং তাদের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির ওপর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এই প্রস্তাবকে অত্যন্ত 'একতরফা ও অন্যায্য' বলে মন্তব্য করেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ঠিক কোন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে এই গোপন সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি এক বক্তব্যে দাবি করেছেন যে, ইরানি কর্মকর্তারা প্রাণনাশের ভয়ে এই আলোচনার বিষয়টি জনসমক্ষে অস্বীকার করছেন। ট্রাম্পের মতে, ইরানি প্রতিনিধিরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে অত্যন্ত আগ্রহী হলেও তারা আশঙ্কা করছেন যে, এই খবর জানাজানি হলে তারা তাদের নিজ দেশের কট্টরপন্থীদের হাতে অথবা মার্কিন বাহিনীর হাতে হামলার শিকার হতে পারেন। এই ভীতিই মূলত আলোচনার গতিকে ধীর করে দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জি-৭ (G7) ভুক্ত দেশগুলোর সাথে এই সংকট নিয়ে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছেন। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ভাদেফুল হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। জার্মানি ইতিমধ্যে ৩০টিরও বেশি দেশের সেনাপ্রধানদের সাথে এই বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন করেছে, যদিও তারা সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতের অংশ না হওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য ইউক্রেনের সহায়তার তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথ রক্ষায় ন্যাটো মিত্রদের অপর্যাপ্ত ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে মিত্র দেশগুলো তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের পর এটিই ছিল তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক, যেখানে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এড়াতে এবং বিশ্বজুড়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েনের মধ্যে ২০২৬ সালের এপ্রিলের সময়সীমাটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
2 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Cyprus Mail
Der Tagesspiegel
Council on Foreign Relations
CBS News
Reuters
The Times of Israel
Britannica
The Guardian
The Times of Israel
Anadolu Ajansı
Al Jazeera
এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



