ইসরায়েল এবং আর্জেন্টিনা সম্প্রতি 'ইসহাক চুক্তি' (Isaac Accord) নামক একটি নতুন কৌশলগত চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই শক্তিশালী অংশীদারিত্ব মূলত প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্য ক্ষেত্রে দেশ দুটির বন্ধনকে আরও গভীর করবে এবং গ্লোবাল সাউথ অঞ্চলে ইসরায়েলের প্রভাবকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করবে।
এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি জেরুজালেমে আসে, যেখানে উভয় নেতা একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। 'ইসহাক' নামটি একটি গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে যা বাইবেলে বর্ণিত ইব্রাহিমের (আব্রাহাম) পুত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়; এটি একইসাথে ইহুদি ধর্মের প্রতি মাইলেইর ব্যক্তিগত এবং সাংস্কৃতিক অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ।
ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে উগ্র উদারপন্থী নেতা মাইলেইর বিজয় আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রথম লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ৭ অক্টোবরের পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইসরায়েল সফর করেন এবং জেরুজালেমকে দেশটির রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করার সাহসী পদক্ষেপ নেন।
ঐতিহাসিক সম্পর্কের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ১৯৭০ এবং ৮০-র দশকে আর্জেন্টিনা ইসরায়েলে ইউরেনিয়াম সরবরাহ করত, কিন্তু পরবর্তীতে একনায়কতন্ত্র এবং পেরনপন্থী রাজনৈতিক আদর্শের প্রভাবে সেই সম্পর্কগুলো ছিন্ন হয়ে যায়। বর্তমান সময়ে মাইলেই ব্রিকস (BRICS) জোটকে 'কমিউনিস্ট' প্রভাবের ভয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার দেশের পূর্ণ সমর্থন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে নিবদ্ধ করেছেন।
এই চুক্তির টাইমিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল বর্তমানে ইরান এবং হিজবুল্লাহর আঞ্চলিক আধিপত্য মোকাবিলায় শক্তিশালী মিত্র খুঁজছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে মুদ্রাস্ফীতি ৩০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং আইএমএফ-এর বিশাল ঋণের বোঝা রয়েছে; তাই মাইলেইর জন্য ইসরায়েলের লিথিয়াম এবং কৃষি প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই চুক্তির একটি প্রধান স্তম্ভ হলো লিথিয়াম খাতে বিনিয়োগ; ইসরায়েল আর্জেন্টিনার এই প্রাকৃতিক সম্পদে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যা মূলত উন্নত ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হবে। বিনিময়ে আর্জেন্টিনা তাদের সামুদ্রিক বন্দরগুলো ইসরায়েলি রপ্তানি পণ্যের অবাধ যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
এই কৌশলগত পদক্ষেপটি লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিলের লুলা সরকার এবং ভেনেজুয়েলার প্রভাবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, যা মেরকোসার (MERCOSUR) বাণিজ্যিক ব্লকের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে ইসরায়েল এমন এক অঞ্চলে পা রাখার সুযোগ পাচ্ছে যেখানে বর্তমানে চীনের শক্তিশালী আধিপত্য বিদ্যমান।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করলে তিনটি সম্ভাবনা দেখা দেয়: প্রথমত, একটি ইতিবাচক প্রেক্ষাপট যেখানে এই জোট আরও প্রসারিত হবে এবং চিলি বা প্যারাগুয়ের মতো দেশগুলোও তেল আবিবের দিকে ঝুঁকবে। দ্বিতীয়ত, একটি নেতিবাচক দিক যেখানে ২০২৬ সালে মাইলেইর সম্ভাব্য রাজনৈতিক পতন এই চুক্তিকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিতে পারে। তবে সবচেয়ে জোরালো সম্ভাবনা হলো যে, ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং সম্পর্কটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।
অবশ্য এই চুক্তির সমালোচনাও রয়েছে; অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে 'নব্য সাম্রাজ্যবাদ' হিসেবে দেখছেন যেখানে আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং লিথিয়ামের মতো মূল্যবান সম্পদ সস্তায় বিদেশে চলে যাবে বলে তারা মনে করেন। এ ছাড়া চুক্তির কিছু অপ্রকাশিত গোপন শর্তাবলী নিয়েও স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ রয়েছে।
পরিশেষে, দক্ষিণ আমেরিকার এই কূটনৈতিক মোড় পরিবর্তন সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত যা এই অঞ্চলে ইরানের প্রভাবকে খর্ব করতে সাহায্য করবে। আর্জেন্টিনার সাধারণ জনগণের জন্য এটি প্রযুক্তি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেও এর সাথে জড়িত সামরিকীকরণের ঝুঁকি এড়ানো যাবে না; তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি চীনা প্রভাবের বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।



