আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক বিশাল ও অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। ইরান সরকার কর্তৃক কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দামে ১০ শতাংশের বেশি বড় ধরনের পতন রেকর্ড করা হয়েছে। লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে এই নাটকীয় সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য স্বস্তির পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুক্রবার বিকেলের দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তার ভেরিফাইড এক্স হ্যান্ডেলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা প্রদান করেন। তিনি তার বার্তায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, লেবাননে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শান্তি প্রক্রিয়া বা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের ফলে হরমুজ প্রণালী এখন আন্তর্জাতিক নৌ ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ ও উন্মুক্ত। উল্লেখ্য, এই জলপথটি সারা বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য একক বৃহত্তম এবং প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত, যার মধ্য দিয়ে প্রতিদিন বিশ্ব জ্বালানি চাহিদার এক বিশাল অংশ সরবরাহ করা হয়।
এই চাঞ্চল্যকর খবরের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি এবং পুঁজিবাজার উভয় ক্ষেত্রেই এক তাৎক্ষণিক ও অভাবনীয় প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই (WTI) তেলের দাম ১২ শতাংশের বেশি তীব্রভাবে হ্রাস পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৮২ ডলারের আশেপাশে নেমে এসেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ১০ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলারে স্থিতিশীল হয়েছে। তেলের দাম কমায় বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক মনোভাব দেখা দিয়েছে, যার প্রভাবে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক সূচক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে নতুন ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং ডাউ জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ সূচক ১.৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নতুন উন্নয়ন ও তেলের বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি একটি কূটনৈতিক সতর্কবার্তাও দিয়েছেন যে, ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর ওপর আগে থেকে আরোপিত অবরোধ বা ব্লকেড আলোচনা পুরোপুরি সফলভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত বজায় থাকবে। ট্রাম্প তার বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল শর্তাবলি নিয়ে ইতিমধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি শক্তিশালী ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে এই চলমান ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি সামনের দিনগুলোতে আরও দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
যদিও ইরান কর্তৃক প্রণালীটি পুনরায় উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তবুও সেখানে নিয়মিত নৌ চলাচলের স্বাভাবিক গতি ফিরে আসা এবং পুনরুদ্ধারের প্রকৃত সময়সীমা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে এখনও কিছুটা সন্দেহ ও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এই জলপথে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে আগে থেকে সংঘাতের কারণে পেতে রাখা শক্তিশালী সামুদ্রিক মাইনগুলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছে যে, ইরান কি সত্যিই তাদের বর্তমান কারিগরি সক্ষমতা দিয়ে এত দ্রুত এই বিশাল জলপথটি পুরোপুরি মাইনমুক্ত করতে পারবে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌ-বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তায় মাইন অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করার বিষয়টি বর্তমানে উচ্চপর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে। তবে বাজারের বর্তমান প্রবণতা দেখে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে, চলতি মাসের শেষ নাগাদ এই উদ্ভূত সংকটের একটি স্থায়ী, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।



