২০২৫ সালের ৮ই অক্টোবর, রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস রসায়নে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে। এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে সুসুবু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন এবং ওমর এম. ইয়াহিকে, তাঁদের যুগান্তকারী মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (MOF) উদ্ভাবনের জন্য। এই আবিষ্কারটি রাসায়নিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি মানবজাতির বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই তিনজন বিজ্ঞানী—যথাক্রমে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে-এর গবেষক—এমন এক আণবিক স্থাপত্য তৈরি করেছেন যা পূর্বে অকল্পনীয় ছিল।
তাঁদের নির্মিত কাঠামো হলো এক ধরনের স্ফটিক, যেখানে ধাতব আয়নগুলি জৈব অণু দ্বারা সংযুক্ত হয়ে বিশাল, পরিবর্তনযোগ্য গহ্বর বা স্থান তৈরি করে। এই ছিদ্রযুক্ত উপাদানগুলি, যা MOF নামে পরিচিত, গ্যাস এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থকে অবাধে চলাচল করতে দেয়। নোবেল কমিটি ফর কেমিস্ট্রি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে MOF-এর সম্ভাবনা অপরিসীম, যা নতুন কার্যকারিতা সহ কাস্টম-মেড উপকরণের অপ্রত্যাশিত সুযোগ এনে দিয়েছে। এই কাঠামোগুলি কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণে, হাইড্রোজেন সঞ্চয় করতে, জল থেকে দূষক পদার্থ পরিস্রুত করতে এবং এমনকি মরুভূমির বাতাস থেকে জল আহরণ করতেও ব্যবহৃত হতে পারে। ২০২২ সালে, তাঁর দল ডেথ ভ্যালিতে MOF পরীক্ষা করে, যেখানে ১ কেজি উপাদান প্রতিদিন শুষ্ক বাতাস থেকে ১১৪ থেকে ২১০ গ্রাম জল আহরণ করতে সক্ষম হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, CALF-20 নামক একটি MOF শিল্প বর্জ্য থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণে অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছে এবং কানাডার একটি কারখানায় এটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। ২০২০ সালে, ইয়াহি অ্যাটোকো (Atoco) নামে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য ছিল কার্বন ক্যাপচার এবং বায়ুমণ্ডল থেকে জল সংগ্রহের জন্য MOF প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ করা।
এই অগ্রদূতদের মধ্যে, রিচার্ড রবসন ১৯৮৯ সালে প্রথম এই ধরনের আণবিক নির্মাণ নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন, যেখানে তিনি কপার আয়নগুলিকে একটি চার-বাহুযুক্ত অণুর সাথে সংযুক্ত করেছিলেন, যা একটি সুবিন্যস্ত, স্থানযুক্ত স্ফটিক তৈরি করেছিল। যদিও প্রাথমিক কাঠামোটি অস্থিতিশীল ছিল, কিতাগাওয়া এবং ইয়াহির পরবর্তী কাজ এটিকে একটি দৃঢ় ভিত্তি প্রদান করে। কিতাগাওয়া দেখিয়েছিলেন যে এই কাঠামোতে গ্যাস প্রবাহিত হতে পারে এবং তিনি এর নমনীয়তা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। অন্যদিকে, ইয়াহির কৃতিত্ব হলো একটি অত্যন্ত স্থিতিশীল MOF তৈরি করা এবং যৌক্তিক নকশার মাধ্যমে এটিকে নতুন বৈশিষ্ট্য দেওয়ার ক্ষমতা প্রদর্শন করা। রেটিকুলার রসায়নের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত ওমর ইয়াহি, ১৯৯৫ সালে কার্বক্সিলেট লিঙ্কার ব্যবহার করে মেটাল-অর্গানিক কাঠামোর স্ফটিককরণ অর্জন করেন, যা কাঠামোকে দৃঢ়তা এবং স্থায়ী ছিদ্রযুক্ততা প্রদান করে। ১৯৯৯ সালে ইয়াহি MOF-5 উপস্থাপন করেন – একটি অতি-উচ্চ ছিদ্রযুক্ত উপাদান, যার অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল এতটাই বিশাল যে মাত্র কয়েক গ্রাম এই পদার্থ একটি ফুটবল মাঠের সমতুল্য স্থান ধারণ করতে পারে। এই যুগান্তকারী কাজের ফলস্বরূপ, রসায়নবিদরা এখন দশ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের MOF তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
সুসুবু কিতাগাওয়ার স্বপ্ন হলো নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড, অক্সিজেন বা জলকে পৃথক করে সেগুলিকে ব্যবহারযোগ্য উপাদানে রূপান্তর করা। ইয়াহির মতে, বিজ্ঞান হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমতাকরণকারী শক্তি, যা তাঁর মতো শরণার্থীদের সন্তানকেও এই উচ্চতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। এই স্বীকৃতি বিজ্ঞানীদের নিরলস অধ্যবসায়ের প্রতিফলন, যা মানবকল্যাণে সর্বোচ্চ অবদান রেখেছে। আগামী ২০২৫ সালের ১০ই ডিসেম্বর স্টকহোমে এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এই উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে মৌলিক রাসায়নিক গবেষণা কীভাবে বাস্তব জগতের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলির জন্য কার্যকর সমাধান দিতে পারে, যা আমাদের সম্মিলিত অগ্রগতির পথকে আলোকিত করে।



