মারিয়া করিনা মাচাদোর ভেনেজুয়েলায় প্রত্যাবর্তন: আগাম নির্বাচনের দাবিতে বিরোধীদের ক্রমবর্ধমান চাপ

সম্পাদনা করেছেন: lee author

ভেনেজুয়েলার প্রভাবশালী বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো ২০২৬ সালের শেষের দিকে স্বদেশে ফিরে আসার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এবং দেশটিতে পুনরায় সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ডাক দিয়েছেন। ২০ শে এপ্রিল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা প্রদান করেন, যা ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে দেশটিতে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকে নতুন রূপ দিয়েছে।

এই ঘোষণাটি আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে এর জোরালো প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। মাচাদোর এই পদক্ষেপ কেবল ল্যাটিন আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্ককেই প্রভাবিত করছে না, বরং বিশ্ব তেলের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে।

ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০২৩ সালে মাচাদোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করার পর, ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধীরা ভোট বর্জন করে। সেখানে নিকোলাস মাদুরো নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করলেও বিরোধী দলীয় প্রার্থী গঞ্জালেসের জয়ের পরিসংখ্যান সামনে আসে। এই সংঘাতের ফলে গত কয়েক বছরে দেশটি থেকে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় দেশটির প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

২০২৫ সালে ব্রাজিল এবং কলম্বিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলো মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও মাদুরো সরকার 'বার্সেলোনা প্যাক্ট' বা বার্সেলোনা চুক্তি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ২০১৯ সালের হুয়ান গুয়াইদোর ব্যর্থ আন্দোলনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ ফাটলের কারণে বিরোধী জোট সফল হতে পারেনি।

বর্তমানের এই রাজনৈতিক চাপের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে দেশটির তলানিতে ঠেকে যাওয়া তেল উৎপাদন। ২০২০ সালে যেখানে প্রতিদিন ১.২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদিত হতো, বর্তমানে তা মাত্র ৭ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। এর পাশাপাশি ২০২৬ সালে ব্রাজিলের আসন্ন নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা মাদুরো সরকারের ওপর মার্কোসুর (MERCOSUR) নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছেন।

রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার দিক থেকে মাচাদো বর্তমানে অনেক এগিয়ে আছেন; দাতানালিসিস (Datanalisis)-এর তথ্যমতে তার জনসমর্থন প্রায় ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে, মাদুরো রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ (PDVSA)-এর মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। নেপথ্যে চীনের কাছে ভেনেজুয়েলার ৬০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং রাশিয়ার সরবরাহকৃত এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূ-রাজনৈতিকভাবে মাদুরোকে সুরক্ষা দিচ্ছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতা হস্তান্তরের বিনিময়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, কাতার এবং তেল কোম্পানি এক্সনমোবিলের (ExxonMobil) অংশগ্রহণে কিছু গোপন আলোচনা বা 'ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি' চলছে। তবে স্ট্রাটফোর (Stratfor)-এর বিশ্লেষণে একটি ভিন্নধর্মী মতও উঠে এসেছে, যেখানে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে মাচাদোকে হয়তো রুশ নেতা নাভালনির মতো পরিস্থিতির শিকার হয়ে নির্বাসনে যেতে হতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দুটি প্রধান চিত্র ফুটে উঠছে। একটি হলো আশাব্যঞ্জক বা অপটিমিস্টিক, যেখানে চিলির ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মতো ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে। অন্যটি হলো চরম নৈরাশ্যজনক, যেখানে দমন-পীড়ন বৃদ্ধি এবং কারাকাস শহরে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিরোধীদের দমন করা হতে পারে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট, যার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ। এমনটি হলে দেশটির মুদ্রাস্ফীতি ৫০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং আরও ১০ লাখ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে পারে।

যদিও কঠোর সেন্সরশিপের কারণে পর্দার অন্তরালের সব তথ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তবে রয়টার্সের এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক মহলে মাচাদোর প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার এই অস্থিরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির সরবরাহ বিশ্বের মোট তেলের ৫ শতাংশ। মাচাদোর ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৩ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের কাছে এই রাজনীতির মানে হলো দিনে মাত্র ২ ডলার আয়ের বিপরীতে দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা খোঁজা।

আঞ্চলিকভাবে কলম্বিয়া ২০ লাখ শরণার্থীর বাড়তি চাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ব্রাজিল তাদের বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা করছে। পরিশেষে, এটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নয়, বরং দক্ষিণ আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত, যেখানে মাদুরোর পপুলিস্ট শাসনব্যবস্থা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Venezuela's Machado plans to return home by end of year, urges swift elections

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।