অ্যাপলের নেতৃত্বে পটপরিবর্তন: সিইও পদে জন টারনাস এবং নতুন ভূমিকায় টিম কুক

সম্পাদনা করেছেন: lee author

রয়টার্সের একটি সাম্প্রতিক সংবাদ প্রযুক্তি বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে: অ্যাপল তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মুখ জন টারনাসকে নতুন সিইও হিসেবে মনোনীত করেছে এবং টিম কুক এখন থেকে এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ৩ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাজার মূলধনের এই টেক জায়ান্টের নেতৃত্বের এই পরিবর্তন এশিয়ার সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে শুরু করে সিলিকন ভ্যালির প্রতিটি উদ্ভাবনী পদক্ষেপে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

টিম কুকের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই জল্পনা-কল্পনা চলছিল। ৫০ বছর বয়সী জন টারনাস, যিনি ২০০১ সাল থেকে অ্যাপলে কাজ করছেন এবং বর্তমানে হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন, তিনি কোম্পানির ভেতরে অত্যন্ত সম্মানিত একজন ব্যক্তিত্ব। ব্লুমবার্গের মার্ক গুরম্যান এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

টারনাস মূলত অ্যাপলের এম-সিরিজ চিপের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই উদ্ভাবনটি অ্যাপলকে এআরএম (ARM) আর্কিটেকচারে শীর্ষস্থানে নিয়ে এসেছে। তার এই প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং হার্ডওয়্যাৱে অগাধ জ্ঞান তাকে অ্যাপলের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য যোগ্যতম করে তুলেছে।

২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া টিম কুকের রাজত্বকাল ছিল মূলত দক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খল পরিচালনা এবং সেবা খাতের অসামান্য প্রবৃদ্ধির সময়। অ্যাপ স্টোর এবং অ্যাপল মিউজিকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এই সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অ্যাপলের ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন (১০-কে) অনুযায়ী, কোম্পানিটির বার্ষিক আয় ছিল ৩৮৩ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে কুক চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারত ও ভিয়েতনামে উৎপাদন বৈচিত্র্য আনার সাহসী পদক্ষেপ নেন।

তবে বিনিয়োগকারী এবং সমালোচকদের একটি অংশ সবসময়ই এআই (AI) এবং ভিআর (VR) প্রযুক্তিতে অ্যাপলের কিছুটা ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গুগল এবং মেটার মতো প্রতিযোগীদের তুলনায় অ্যাপল এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জন টারনাসের নেতৃত্ব এই অভাব পূরণে সহায়ক হবে বলে অনেকেই মনে করছেন।

টারনাসকে মূলত ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির দিকে অ্যাপলের একটি বড় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার নেতৃত্বে তৈরি হওয়া এ-সিরিজ এবং এম-সিরিজ চিপগুলি অ্যাপল সিলিকন রূপান্তরের পথ প্রশস্ত করেছে, যা ২০২০ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালে পূর্ণতা পায়। এই পরিবর্তনটিকে একজন স্থিতিশীল ম্যারাথন দৌড়বিদের থেকে একজন দ্রুতগামী স্প্রিন্টারের হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অ্যাপলের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইএইচএস মার্কিট-এর ২০২৪ সালের তথ্যমতে, অ্যাপলের ৯০ শতাংশ চিপ সরবরাহ করে তাইওয়ানের টিএসএমসি (TSMC)। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে হার্ডওয়্যার বিশেষজ্ঞ হিসেবে টারনাস উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারেন। নিক্কেই এশিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে আইফোন ১৫-এর উৎপাদন বৃদ্ধি তারই একটি ইঙ্গিত হতে পারে।

টিম কুকের আমলে অ্যাপলের শেয়ারের দাম ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা নতুন ধারণার অপেক্ষায় আছেন। মাইক্রোসফট যেভাবে সত্য নাদেলার নেতৃত্বে ক্লাউড এবং এআই (কো-পাইলট) প্রযুক্তিতে বিপ্লব এনেছে, অ্যাপলকেও এখন তাদের ডিভাইসে তেমন কিছু করে দেখাতে হবে। অ্যাপলের বর্তমান পি/ই রেশিও ২৮ গুণ, যা বজায় রাখতে হলে উদ্ভাবনী চমকের প্রয়োজন।

যদি এই নেতৃত্বের পরিবর্তন চূড়ান্ত হয়, তবে এটি প্রমাণ করবে যে অ্যাপল এখন একজন ম্যানেজারের পরিবর্তে একজন তুখোড় ইঞ্জিনিয়ারের ওপর ভরসা করছে। স্যামসাং থেকে এনভিডিয়া—সব টেক জায়ান্টরাই এখন অ্যাপলের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর কড়া নজর রাখবে। সিলিকন ভ্যালির উজ্জ্বল রোদে জন টারনাসের হাত ধরে অ্যাপল এক নতুন উদ্ভাবনী দিগন্তের পথে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে।

4 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Apple names insider John Ternus as CEO, Cook to become executive chairman

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।