বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি বড় অংশ যখন অন্য আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন চীন আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য তাদের শুল্ক ব্যবস্থায় এক বড় পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। অধিকাংশ আফ্রিকান রাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেইজিং। এই তালিকায় ব্যতিক্রম শুধু এসোয়াতিনি, যারা এখনও তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয় এবং চীনের সাথে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে না।
রয়টার্স এবং বিবিসি-র মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপকে চীন ও আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। বেইজিং আফ্রিকান রপ্তানিকারকদের জন্য তাদের বাজারের দুয়ার খুলে দিচ্ছে, যার মধ্যে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কোবাল্ট এবং আইভরি কোস্টের কোকোর মতো পণ্য রয়েছে। যেসব দেশের অর্থনীতির বড় অংশ কাঁচামাল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা বাণিজ্য বাধা কমিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করতে পারে।
একইসঙ্গে এসোয়াতিনিকে বাদ রাখার বিষয়টি এটিই প্রমাণ করে যে, এই অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো আসলে 'এক চীন' নীতির সাথে সরাসরি যুক্ত। যেসব দেশ চীনকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক রাখে না, তারা চীনা বাজারে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে; অন্যদিকে তাইপের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলো এই তালিকার বাইরেই রয়ে গেছে।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চীন আফ্রিকার অনেক দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। 'ফোরাম অন চায়না-আফ্রিকা কোঅপারেশন' এবং 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' উদ্যোগের মাধ্যমে বেইজিং সড়ক, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলসহ অসংখ্য অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। নতুন এই শূন্য শুল্ক নীতি আগের ধারাকেই আরও শক্তিশালী করছে, যা পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়াবে: একদিকে আফ্রিকান সরকারগুলো ১৫০ কোটিরও বেশি ভোক্তার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে চীন নিশ্চিত করবে তাদের প্রয়োজনীয় সম্পদের জোগান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে রাজনৈতিক সমর্থন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদি আফ্রিকার কাঁচামাল কোনো শুল্ক ছাড়াই চীনে পৌঁছায়, তবে তা লজিস্টিক রুট বদলে দিতে পারে এবং বিনিয়োগের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। চীন ও আফ্রিকার মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ইতিমধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং নতুন এই পদক্ষেপ সেই প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
তবে আফ্রিকান ও বিদেশি বিশ্লেষকদের একটি অংশ সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও তুলে ধরছেন। এর মধ্যে রয়েছে চীনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা বৃদ্ধি, স্থানীয় বাজারে সস্তা চীনা পণ্যের আধিপত্য এবং বেশ কিছু আফ্রিকান দেশের ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
সুতরাং, অধিকাংশ আফ্রিকান দেশের জন্য আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি চীনের এক বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে তারা 'গ্লোবাল সাউথ'-এ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এবং পশ্চিমা দাতাদের ওপর কম নির্ভরশীল একটি অংশীদার গোষ্ঠী তৈরি করতে চায়। আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি যখন অন্যান্য সংকটের দিকে নিবদ্ধ, তখন চীন ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই নতুন বিন্যাস অব্যাহত রয়েছে, যা এই মহাদেশের স্বার্থের ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ধরনকে প্রভাবিত করছে।



