গুগল ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মধ্যে জেমিনি এআই ব্যবহারের গোপনীয় চুক্তি ও নীতিগত আলোচনা

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

গুগল ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মধ্যে জেমিনি এআই ব্যবহারের গোপনীয় চুক্তি ও নীতিগত আলোচনা-1

অ্যালফাবেট ইনকর্পোরেটেড, যা গুগলের মূল সংস্থা, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (DoD)-এর সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উন্নত পর্যায়ের আলোচনা পরিচালনা করছে। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো পেন্টাগনকে তাদের অত্যাধুনিক জেমিনি (Gemini) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো অত্যন্ত গোপনীয় এবং শ্রেণীবদ্ধ (classified) পরিবেশে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া। ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত এই সংবাদটি মার্কিন প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোতে বাণিজ্যিক এআই প্রযুক্তির দ্রুত অন্তর্ভুক্তির একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা মূলত কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যয় হ্রাসের কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বর্তমানে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, লজিস্টিক পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে জেনারেটিভ এআই বা সৃজনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। ক্রমবর্ধমান বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার মুখে নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বজায় রাখাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই জেমিনি এআই-কে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে করে জটিল সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াগুলো আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

তবে এই চুক্তির ক্ষেত্রে গুগল অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে কিছু নির্দিষ্ট নীতিগত সীমাবদ্ধতা বা সেফগার্ড আরোপের দাবি জানিয়েছে। গুগলের প্রস্তাবিত এই শর্তাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো মার্কিন নাগরিকদের ওপর কোনো ধরনের ব্যাপক অভ্যন্তরীণ নজরদারি চালানোর জন্য এই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া, পর্যাপ্ত মানবিক নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি ছাড়া কোনো ধরনের সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত মরণঘাতী অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি কিংবা মোতায়েনের ক্ষেত্রেও জেমিনি এআই ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে গুগল কর্তৃপক্ষ।

গুগলের এই নীতিগত অবস্থান ওপেনএআই (OpenAI)-এর সাম্প্রতিক নিরাপত্তা শর্তাবলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, এর আগে অ্যানথ্রোপিক (Anthropic)-এর মতো ডেভেলপারদের সাথে প্রতিরক্ষা দপ্তরের এই ধরণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বেশ কিছু উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে প্রতিরক্ষা দপ্তরের অ-শ্রেণীবদ্ধ বা নন-ক্লাসিফাইড সিস্টেমে জেমিনি এআই-এর ব্যবহার ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে 'GenAI.mil' নামক একটি বিশেষ সামরিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১১ লক্ষেরও বেশি ব্যবহারকারী গুগলের এই বিশেষায়িত সরকারি সংস্করণটি ব্যবহার করতে শুরু করেছেন যা নিয়ন্ত্রিত অ-গোপনীয় তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে।

উল্লেখ্য যে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর ছয়টি শাখার মধ্যে পাঁচটিই ইতোমধ্যেই তাদের কর্পোরেট বা দাপ্তরিক কাজের জন্য জেমিনি-কে প্রধান এআই প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি অ-শ্রেণীবদ্ধ নেটওয়ার্কগুলোতে এই প্রযুক্তির ওপর সামরিক বাহিনীর ব্যাপক আস্থার প্রতিফলন ঘটায়। বর্তমানে এই ব্যবহার শুধুমাত্র আইএল-৫ (IL-5) স্তরের নেটওয়ার্কগুলোতে সীমাবদ্ধ। তবে এখন মূল লক্ষ্য হলো উচ্চতর নিরাপত্তা স্তরের সিস্টেমে জেমিনি-কে মোতায়েন করা, যাতে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ, বৈশ্বিক লজিস্টিক সমন্বয় এবং রিয়েল-টাইম সাইবার হুমকি শনাক্তকরণ সহজতর হয়।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যিক এআই মডেলগুলোর এই ধরণের গভীর সংহতি মার্কিন সামরিক কমান্ড কাঠামোর একটি স্থায়ী উপাদানে পরিণত হতে চলেছে। এই শক্তিশালী প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে আসা মানেই হবে যুদ্ধের ময়দানে কৌশলগত সুবিধা হারানো। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট আরও স্পষ্ট হয় ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে। তিনি প্রতিরক্ষা দপ্তরকে সাময়িকভাবে 'ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার' বা 'যুদ্ধ মন্ত্রণালয়' হিসেবে অভিহিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা মূলত মার্কিন সামরিক অবস্থানকে আরও আক্রমণাত্মক এবং শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরার একটি প্রতীকী প্রচেষ্টা ছিল।

সরকারি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এআই চুক্তির জন্য বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মধ্যে বর্তমান বাজারে প্রতিযোগিতা এখন তুঙ্গে। গুগল একদিকে যেমন তাদের চুক্তিতে কঠোর নীতিগত সীমানা রক্ষা করতে চাইছে, অন্যদিকে তারা সরকারি পরিষেবার বাজারে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান সুসংহত করতেও বদ্ধপরিকর। এটি একদিকে বাণিজ্যিক নৈতিকতা এবং অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার মধ্যে একটি চলমান ভারসাম্য রক্ষা ও দ্বন্দ্বকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Reuters

  • Quiver Quantitative

  • Breaking The News

  • Reuters

  • MarketScreener

  • The Asia Business Daily

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।