২০২৬ সালের ২১ মার্চ, শনিবার, কিউবা প্রজাতন্ত্রের জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আবারও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, যার ফলে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মার্চ মাসের মধ্যে এটি ছিল তৃতীয় বড় ধরনের বিপর্যয়, যা দ্বীপরাষ্ট্রটির জ্বালানি অবকাঠামোর চরম ভঙ্গুরতাকে সামনে এনেছে। খনি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কামাগুয়ে প্রদেশের 'নুয়েভিতাস' তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি উৎপাদন ইউনিটে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই সংকটের সূত্রপাত হয়। একটি ইউনিটের বিকলতা দ্রুত চেইন রিঅ্যাকশনের মতো পুরো গ্রিডে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যেই পুরো দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিউবান ইলেকট্রিক ইউনিয়ন তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি প্রোটোকল চালু করে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ সচল রাখতে স্থানীয় 'মাইক্রো-আইল্যান্ড' বা ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ বলয় তৈরি করে। হাসপাতাল, জরুরি সেবা কেন্দ্র এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থার মতো অপরিহার্য খাতগুলোকে সচল রাখাই ছিল এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। উল্লেখ্য যে, এই ব্ল্যাকআউটের মাত্র পাঁচ দিন আগে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ সোমবারও দেশটিতে একই ধরনের জাতীয় বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছিল। সরকারি তথ্যমতে, এই সাম্প্রতিক বিভ্রাটের ফলে প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
জ্বালানির তীব্র সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল স্বীকার করেছেন যে, দেশটি বর্তমানে এক চরম সন্ধিক্ষণে রয়েছে এবং গত তিন মাস ধরে বিদেশি অংশীদারদের কাছ থেকে কোনো তেল আসেনি। কিউবার অর্থনীতি সচল রাখতে প্রতিদিন ১ লক্ষ ১০ হাজার ব্যারেল তেলের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে স্থানীয়ভাবে মাত্র ৩০ হাজার ব্যারেল উৎপাদিত হচ্ছে, যা চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ। এই জ্বালানি ঘাটতির কারণে কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই কঠোর রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, যার ফলে অনেক এলাকায় দিনে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
কিউবা সরকার এবং প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-কানেল এই সংকটের জন্য সরাসরি বহিঃশক্তির চাপ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবরোধকে দায়ী করেছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবায় তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের যে হুমকি দিয়েছিলেন, তার প্রভাব এখন দৃশ্যমান। এই চাপের মুখে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যা কিউবার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করত। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কিউবা 'দখল' করার মতো বিতর্কিত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কিউবান নেতৃত্বও যেকোনো সম্ভাব্য 'আক্রমণ' মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সোভিয়েত আমলের পুরনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা বর্তমান সংকটের অন্যতম মূল কারণ। আমদানিকৃত তেলের অভাবে কিউবা এখন যে ভারী সালফারযুক্ত তেল ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, তা এই পুরনো যন্ত্রপাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই এই পদ্ধতিগত সমস্যাগুলো ঘনীভূত হচ্ছে। গত দুই বছরে এই ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি আরও নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের মুখে মার্চ মাসে হাভানায় আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা পৌঁছেছে, যা জাতিসংঘের সতর্কবাণী অনুযায়ী দেশটিতে একটি মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিকেই ফুটিয়ে তুলছে।



