ভারত-অস্ট্রেলিয়া বাণিজ্য চুক্তির চার বছর: রপ্তানি দ্বিগুণ বৃদ্ধি এবং শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য চুক্তি (Ind-Aus ECTA) সম্প্রতি তার সফল চার বছর পূর্ণ করেছে। ২ এপ্রিল ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এই ঐতিহাসিক চুক্তির চতুর্থ বার্ষিকী উপলক্ষে জানিয়েছে যে, এই সমঝোতার ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রবাহে এক অভূতপূর্ব গতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যা উভয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
গত চার বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের পণ্য রপ্তানি অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এই রপ্তানির পরিমাণ ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা চুক্তি স্বাক্ষরের আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই প্রবৃদ্ধির হার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ গত পাঁচ বছরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের রপ্তানি প্রায় পাঁচ গুণ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাণিজ্যিক এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় অস্ট্রেলিয়া ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে শুল্ক বিলুপ্তির চূড়ান্ত ধাপ সম্পন্ন করেছে, যার ফলে এখন সমস্ত ভারতীয় পণ্য অস্ট্রেলীয় বাজারে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে।
ECTA-এর কাঠামোর অধীনে ভারত তার ৭০.৩ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা প্রদান করেছে, যা দুই দেশের মোট বাণিজ্য মূল্যের প্রায় ৯০.৬ শতাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর বিপরীতে, অস্ট্রেলিয়া তার ১০০ শতাংশ ট্যারিফ লাইনেই ভারতকে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার দিয়েছে, যা ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের শতভাগ কভার করে। বিশেষ উল্লেখ্য যে, এই ট্যারিফ লাইনগুলোর ৯৮.৩ শতাংশ চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই শুল্কমুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। অবশিষ্ট ১.৭ শতাংশ বা ১১৩টি ট্যারিফ লাইনের শুল্ক আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই পূর্ণাঙ্গ শুল্ক বিলুপ্তি ভারতীয় টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, রাসায়নিক এবং কৃষি খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে।
এই অংশীদারিত্বের মূল ভিত্তি হলো দুই দেশের অর্থনীতির পরিপূরকতা। অস্ট্রেলিয়া ভারতকে খনিজ সম্পদ, বিরল মৃত্তিকা উপাদান এবং জ্বালানি সম্পদের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ করছে, যা ভারতের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খাতের জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে, এই চুক্তির ফলে ভারত সহজেই বেস মেটাল, তুলা, সার এবং ডালের মতো প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারছে। ECTA-এর প্রভাবে কেবল প্রথাগত পণ্যই নয়, বরং হীরা খচিত গয়না এবং টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতো নতুন ও বৈচিত্র্যময় পণ্যও এখন ভারতের রপ্তানি তালিকায় যুক্ত হয়েছে, যা টেক্সটাইল ও ওষুধ শিল্পের পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পারস্পরিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে ভারতও অস্ট্রেলীয় পণ্যের জন্য তার বাজার উন্মুক্ত করেছে। ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ থেকে কার্যকর হওয়া এই চুক্তির আওতায় ভারত ভেড়ার মাংস এবং উলের ওপর আরোপিত ৩০ শতাংশ শুল্ক অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এছাড়াও অস্ট্রেলীয় ওয়াইন এবং নির্দিষ্ট কিছু সামুদ্রিক খাবারের ওপর শুল্ক পর্যায়ক্রমে কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে উভয় দেশই এই প্রাথমিক সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ 'ব্যাপক অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি' (CECA) দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া CECA-এর আলোচনা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। ১৮ থেকে ২৩ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১১তম রাউন্ডের আলোচনায় পণ্য ও পরিষেবার পাশাপাশি ডিজিটাল বাণিজ্য, উৎপত্তিস্থলের নিয়মাবলী, পরিবেশগত মানদণ্ড, শ্রম অধিকার এবং লিঙ্গ সমতার মতো আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ভারত অস্ট্রেলিয়ার ষষ্ঠ বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। এই সময়ে পণ্য ও পরিষেবার মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫৪.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
বাণিজ্যিক এই অগ্রযাত্রা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ২০২০-২১ অর্থ বছরে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই চার বছরে বাণিজ্যের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার (CAGR) ছিল প্রায় ১৮.৮২ শতাংশ। এই ধারাবাহিক উন্নতি প্রমাণ করে যে, ভারত-অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক জোট গঠনের পথে এক বিশাল পদক্ষেপ।
2 দৃশ্য
উৎসসমূহ
LatestLY
PIB
SME Times
Social News XYZ
HKTDC Research
Findoc
এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



